টেলিযোগাযোগ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘রবি আজিয়াটা পিএলসি’ (Robi Axiata PLC)-র ২০১৯ সালের পরিচালনা করা ‘স্বেচ্ছা অবসর স্কিম’ বা ভিআরএস (VRS)-এর আওতায় কর্মী সুবিধা পরিশোধে গুরুতর অনিয়ম ও কর পরিহারের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব ‘এমপ্লয়ি গ্র্যাচুইটি ফান্ড’ (Employee Gratuity Fund) ব্যবহার করে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টিকে ঘিরে এখন অনুসন্ধানে নেমেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এনবিআরের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, মূল কর, সুদ এবং জরিমানা মিলিয়ে রবির ওপর প্রায় ৩৩ কোটি ৭ লাখ টাকার সম্ভাব্য আর্থিক ও আইনি দায় তৈরি হতে পারে।
যেভাবে তৈরি হলো অনিয়মের অভিযোগ
নথি ও প্রাপ্ত তথ্যের সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর রবির ভিআরএস স্কিম কার্যকর করা হয়, যার অধীনে ২২১ জন কর্মী প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যান। তাদের বিদায়কালীন সুবিধা হিসেবে মোট ৩৮ কোটি ৬৮ লাখ ৮৮ হাজার ২৬৮ টাকা ‘এক্স-গ্রেশিয়া পেমেন্ট’ (Ex-gratia Payment) হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
তবে অভিযোগ উঠে, এর একটি বড় অংশ—অর্থাৎ ২৪ কোটি ৪৭ লাখ ২৪ হাজার ১১৬ টাকা অবৈধভাবে ‘রবি এমপ্লয়ি গ্র্যাচুইটি ফান্ড’ থেকে পরিশোধ করা হয়।
পারকুইজিট কর পরিহার: অর্থটি প্রকৃত বিচারে করযোগ্য ‘এক্স-গ্রেশিয়া’ বা চাকরি-সংক্রান্ত অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা হওয়া সত্ত্বেও তাকে করমুক্ত ‘গ্র্যাচুইটি সুবিধা’ হিসেবে হিসাবভুক্ত করা হয়। এর ফলে প্রযোজ্য ৪৫ শতাংশ পারকুইজিট কর পরিশোধ করা হয়নি, যার মাধ্যমে আনুমানিক ১৭ কোটি ৪০ লাখ টাকার রাজস্ব ঝুঁকি সৃষ্টি করা হয়।
ব্যক্তিগত আয়কর ফাঁকি: এ প্রক্রিয়ায় অর্থ গ্রহণকারী ২২১ জন কর্মীরও ব্যক্তিগত আয়কর পরিশোধে বড় ধরণের আড়াল তৈরি হয়েছে।
উপলব্ধ নথি ও সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বয়ান থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের শুরুতেই ভিআরএসের অর্থ পরিশোধে গ্র্যাচুইটি ফান্ড ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে অভ্যন্তরীণ প্রশ্ন ওঠে।
কোম্পানির সাবেক হেড অব পিপল এক্সিলেন্স এবং গ্র্যাচুইটি ট্রাস্টি বোর্ডের তৎকালীন সদস্য মারুফ উল আলম চৌধুরী বিষয়টির তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন। তিনি জানান, এনবিআরের পূর্বানুমোদন এবং ট্রাস্টি ডিড (Trustee Deed) সংশোধন ছাড়া গ্র্যাচুইটির নামে এই অর্থ দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি ছিল।
তিনি অভিযোগে উল্লেখ করেন, “তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তা শাহেদ আলমের হস্তক্ষেপে এবং কম্পেনসেশন অ্যান্ড রিওয়ার্ডস বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত তাসনুভা জামানের (বর্তমানে রবির ডিরেক্টর, পিপল অ্যান্ড অর্গানাইজেশন এক্সপার্টিজ) মাধ্যমে ট্রাস্টি বোর্ডের পরামর্শ উপেক্ষা করে এই অর্থ পরিশোধ করা হয়।”
পরবর্তীতে ২০২০ সালের মে মাসে তড়িঘড়ি করে ট্রাস্টি ডিডে সংশোধন এনে এনবিআরের কাছে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। এনবিআর ১৫ জুলাই ২০২০ তারিখ থেকে সেই সংশোধনী কার্যকর হিসেবে অনুমোদন দেয়। তবে কর আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুমোদনটি ২০২০ সালের জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ায় তা ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বরের অতীত লেনদেনকে কোনোভাবেই কভার বা আইনগত বৈধতা দেয় না।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একজন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) নিশ্চিত করেছেন যে, ভিআরএস পেমেন্টের প্রকৃত ধরণ ও করগত আইনি দিক পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করেন, “কোনো অর্থকে খাতায় গ্র্যাচুইটি হিসেবে লিখলেই তা করমুক্ত হয়ে যায় না। সংশোধিত ডিডের অনুমোদন অতীতে করা অনিয়মকে বৈধতা দিতে পারে না। চূড়ান্ত তদন্ত শেষে প্রমাণ মিললে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কর, বিলম্ব সুদ ও জরিমানা আদায় করা হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আল-আমিন এই অনিয়মকে কেবল কর ফাঁকি নয়, বরং করপোরেট গভর্ন্যান্স ও নৈতিকতার বড় ঘাটতি হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “এমপ্লয়ি গ্র্যাচুইটি ফান্ড একটি সংরক্ষিত ট্রাস্ট ফান্ড। ভুল নিয়মে কোটি কোটি টাকা পরিশোধের খেসারত দিতে হলে রবির নিট মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে চলতি কর্মীবৃন্দের মুনাফার অংশ (WPPF) এবং শেয়ারহোল্ডারদের ডিভিডেন্ড ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”




















