বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) প্রণীত ‘টেলিকমিউনিকেশনস নেটওয়ার্ক অ্যান্ড লাইসেন্সিং নীতি, ২০২৫’ অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ প্রণীত এ নীতি বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) হাতে।
কেন এ নীতি প্রয়োজন
সরকারের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমানে কার্যকর থাকা লাইসেন্স কাঠামো মূলত 2G/3G যুগে তৈরি। ফলে ৫জি, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ক্লাউড কম্পিউটিং ও ব্লকচেইনের মতো নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে।
- লাইসেন্স নবায়ন ও সম্প্রসারণে দীর্ঘসূত্রতা বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে।
- গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় সেবা সম্প্রসারণের পর্যাপ্ত প্রণোদনা নেই।
- একাধিক সেবা একত্রে দেওয়ার (Convergence) সুযোগ সীমিত।
- ফলে দেশের টেলিকম ইকোসিস্টেম আর বাস্তব চাহিদা মেটাতে পারছে না।
নীতির উদ্দেশ্য
নীতির মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, নিরাপদ, বহুবিধ ও সাশ্রয়ী ডিজিটাল সেবার কেন্দ্রে পরিণত করা। এজন্য নেটওয়ার্ককে আরও সরল ও অভিযোজনশীল করা এবং লাইসেন্সিং কাঠামোকে প্রতিযোগিতামূলক ও বিনিয়োগবান্ধব করা।
নতুন লাইসেন্স কাঠামো
খসড়া নীতিতে প্রযুক্তি–নিরপেক্ষ ও সরলীকৃত কাঠামোয় পাঁচ শ্রেণির লাইসেন্স প্রবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে—
- অ্যাক্সেস নেটওয়ার্ক সার্ভিস প্রোভাইডার (ANSP)
- জাতীয় অবকাঠামো এবং সংযোগ পরিষেবা প্রদানকারী (NICSP)
- আন্তর্জাতিক সংযোগ পরিষেবা প্রদানকারী (ICSP)
- নন-টেরেস্ট্রিয়াল নেটওয়ার্ক এবং পরিষেবা প্রদানকারী (NTNSP)
- টেলিকম সক্ষম পরিষেবা প্রদানকারী (TESP)
এর ফলে মধ্যস্বত্বভোগী কমবে, আন্তঃসংযোগ সহজ হবে এবং ব্যয় সাশ্রয়ী সেবা নিশ্চিত করা যাবে।
প্রত্যাশিত সুফল
স্বল্পমেয়াদে (২০২৫–২০২৭):
- ৫০–৬০ বিলিয়ন টাকা নতুন বিনিয়োগ
- দ্রুত ৪জি সম্প্রসারণ ও ৫জি প্রস্তুতি
- বৈধ পথে ট্রাফিক বৃদ্ধি, ফলে ভ্যাট ও ট্যাক্স সংগ্রহ বাড়বে
- ফাইবার দৈর্ঘ্য ১.৭ লাখ কিমি থেকে বেড়ে ৩.৫ লাখ কিমিতে উন্নীত হবে
- টাওয়ার সংখ্যা ৪৮ হাজার থেকে ১ লাখে উন্নীত, যার অর্ধেকের বেশি শেয়ার করা হবে
মধ্যমেয়াদে (২০২৯ পর্যন্ত):
- মোবাইল খাতে সরকারি রাজস্ব ১৩ বিলিয়ন থেকে ২২–২৫ বিলিয়ন টাকায় উন্নীত হবে
- ফিক্সড সার্ভিস খাতে রাজস্ব ৮–১০ বিলিয়ন থেকে ৫৫–৬০ বিলিয়নে উন্নীত
- অবকাঠামো লাইসেন্স খাতে ১৫–২০ বিলিয়ন এবং আন্তর্জাতিক লাইসেন্স খাতে ৫–৬ বিলিয়ন টাকা রাজস্ব আসবে
দীর্ঘমেয়াদে:
- নতুন অপারেটররা আইপিওতে আসবে, ফলে মূলধন বাজারে তারল্য বাড়বে
- ব্রডব্যান্ড, আইপিটিভি ও ক্লাউড সেবার সমন্বিত প্যাকেজ সাশ্রয়ী মূল্যে পাওয়া যাবে
- সামাজিক ও পরিবেশগত দিক
নীতির সুফল ভোগ করবে দেশের সব টেলিকম গ্রাহক। নতুন উদ্যোক্তা ও সেবা প্রদানকারীদের জন্যও এটি সুযোগ তৈরি করবে।
প্রথমবারের মতো পরিবেশ সহনশীল টেলিকম অবকাঠামো নির্মাণের নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া প্রত্যন্ত, উপকূলীয় ও পার্বত্য অঞ্চলে ন্যায্য টেলিকম সেবা পৌঁছে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।
এ সময় প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়বিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, টেলিকমিউনিকেশন নীতিমালা ব্যবসা বান্ধব। যার মধ্য দিয়ে মধ্যসত্বভোগীদের বাদ দেয়া হয়েছে। নতুন আইনের মধ্যে সেবার নিশ্চয়তা আনা হয়েছে।
ইন্টারনেট ডেটাকে সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, দাম কমানোর বিষয়ে স্টারলিংককে পরিকল্পনা দিয়েছে সরকার।
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, যোগাযোগ নীতিমালা ২০২৫ পুরনো ব্যবস্থার নয়া বন্দোবস্ত। আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, নতুন নীতিমালায় গ্রাহকের অধিকার প্রতিষ্ঠা হবে দুর্নীতি কমবে। পাশাপাশি নেটওয়ার্কের মান উন্নয়ন হবে। কিন্তু এখানে নতুন যে সকল লাইসেন্সের বন্দোবস্ত করা হয়েছে তা একপ্রকার নয়া দুর্নীতির বন্দোবস্ত বলা যেতে পারে। আপাতত দলীয় না হলেও স্বজনপ্রীতি হতে পারে বলা যায়। এখানে কাউকে কাউকে স্থায়ী বন্দোবস্ত করে দেওয়া হয়েছে। আবার অনেক ইন্ডাস্ট্রি বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এর সুফল যদি জনগণ এবং রাষ্ট্র না পায় তাহলে এই পলিসির মাধ্যমে বর্তমান সরকার কি অর্জন করতে চায়?





















