দেশের এক সময়কার সবচেয়ে স্থিতিশীল এবং আস্থাশীল আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি (আইবিবিএল) এখন এক গভীর সংকটের মুখে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত সাত বছরে এস আলম গ্রুপের প্রত্যক্ষ মদদে ব্যাংকটিতে কোনো ধরণের বিজ্ঞপ্তি বা পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৮ হাজার ৩৪০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে। অদক্ষতা, ভুয়া সার্টিফিকেট এবং পেশাগত অসদাচরণের মাধ্যমে এই বিশাল জনবল ব্যাংকটিকে কেবল আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতেও ফেলেছে।
অভিযোগ উঠেছে, পটিয়া এলাকার কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণি—যাদের মধ্যে পানের দোকানদার, অটোরিকশাচালক, রাজমিস্ত্রির সহকারী এবং রংমিস্ত্রিও রয়েছেন—মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন। কর্মকর্তাদের দাবি, নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা বা মেধার তোয়াক্কা করা হয়নি। ফলে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এই ব্যাংকটি কার্যত একটি ‘আঞ্চলিক ব্যাংকে’ পরিণত হয়েছে।
ব্যাংক সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এই অবৈধ ও অদক্ষ জনবল পালতে গিয়ে গত ৭ বছরে ব্যাংকটির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রতি বছর কেবল এদের বেতন-ভাতা বাবদ খরচ হচ্ছে ১৫০০ কোটি টাকা। এর বাইরে এস আলম গ্রুপ নামে-বেনামে ব্যাংকটি থেকে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা সরিয়ে নিয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এই বিতর্কিত কর্মকর্তাদের পেশাগত দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষার আয়োজন করলে ৯ শতাংশই তা বয়কট করেন। এমনকি শুক্রবার ভোরে ব্যাংকের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ হ্যাক করার পেছনেও এই বিদ্রোহী কর্মকর্তাদের হাত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা এখন ভল্ট এবং ক্যাশ কাউন্টারের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। অভিযোগ উঠেছে, এই কর্মকর্তাদের কেউ কেউ সন্ত্রাসী কার্যকলাপে উস্কানি দিচ্ছেন এবং প্রয়োজনে ক্যাশ কাউন্টারে হামলার হুমকি দিচ্ছেন।
গ্রাহকদের সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো ব্যাংকটির কর্মীদের আচরণ। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা, গ্রাহকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং কাজে চরম অবহেলার কারণে দীর্ঘদিনের পুরোনো গ্রাহকরা ব্যাংকটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। আমিনুল ইসলাম নামে এক ক্ষুব্ধ গ্রাহক ফেসবুকে লিখেছেন, “পটিয়ার অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্তরাই এখন চাকরি রক্ষার আন্দোলন করছেন, অথচ এস আলমের লুটপাটের বিরুদ্ধে তাদের কোনো প্রতিবাদ নেই।”
ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এস আলমের ছত্রছায়ায় থাকা এই কর্মীরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তোয়াক্কা করতেন না এবং সবসময় নিজেদের পছন্দমতো বদলি বা সুযোগ-সুবিধা আদায়ের জন্য ক্ষমতার অপব্যবহার করতেন। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ইসলামী ব্যাংককে যদি পুনরায় তার হারানো গৌরব ও স্বচ্ছতায় ফিরিয়ে আনতে হয়, তবে এই অবৈধ নিয়োগ বাতিল করে ব্যাপক প্রশাসনিক সংস্কার এবং কঠোর ব্যয় নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

















