অনলাইনে ঝটপট বাজার করার জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম ‘পান্ডামার্ট’ (Pandamart) এখন গ্রাহকদের জন্য এক বিভীষিকার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পচা মাছ, দুর্গন্ধযুক্ত ডিম, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য থেকে শুরু করে সরবরাহকারীদের টাকা আত্মসাৎ ও জালিয়াতির মতো গুরুতর সব অভিযোগ উঠেছে এই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। অথচ অভিযোগ জানিয়েও প্রতিকার পাচ্ছেন না ভুক্তভোগীরা, বরং কাস্টমার কেয়ারের অসহযোগিতা আর রিফান্ড না দেওয়ার ‘ডিজিটাল জবরদস্তি’র শিকার হচ্ছেন তারা।
মাছ-মাংসের নামে ‘পচা’র পসরা
পান্ডামার্টের ফ্রোজেন পণ্যের মান নিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গ্রাহকরা। নুহিয়াত নাহরিন নামের এক গ্রাহক মিরপুর-১ শাখা থেকে রুই ও বাইলাসহ বেশ কিছু মাছ অর্ডার করে দেখেন, রুইয়ের বদলে দেওয়া হয়েছে পচা কাতল মাছ। পুঁটি মাছের প্যাকেটে উপরে ভালো মাছ রেখে নিচে দেওয়া হয়েছে পচা-গলা মাছ। এমনকি ‘প্রসেসড ও ক্লিন’ করার কথা থাকলেও মাছগুলো ছিল নোংরা। ডিফ্রস্ট করার পর প্রতিটি মাছ থেকে বিকিট গন্ধ বের হওয়ায় তা খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ে। একই অভিজ্ঞতা সাইমন সাদিকের; ৮০% মাংসের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তাকে দেওয়া হয়েছে ৬০% হাড় আর মাথার চর্বি।
দুর্গন্ধযুক্ত ডিম ও উধাও কন্টাক্ট নম্বর
গুলশান শাখার পান্ডামার্ট থেকে দুই ডজন ডিম কিনে বিপাকে পড়েন হাসিন জাহান। ডিমগুলো এতটাই পচা ছিল যে গন্ধে ঘরে টেকা দায়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অভিযোগ জানানোর জন্য গুগল ম্যাপে দেওয়া ফোন নম্বরে কল করলে জানা যায়, পান্ডামার্ট ভুল করে এক সাধারণ ব্যক্তির নম্বর সেখানে ব্যবহার করেছে! অর্থাৎ, বিপদে পড়লে গ্রাহক কার সাথে কথা বলবেন, তার কোনো সঠিক মাধ্যমও রাখেনি প্রতিষ্ঠানটি।
শিশুদের খাবারে মেয়াদোত্তীর্ণের ঝুঁকি
ওয়ারী শাখার পান্ডামার্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন ঝুমানা আহমেদ ঝুমি। শিশুদের জন্য কেনা হরলিকসের মেয়াদ ছিল মাত্র দেড় মাস এবং দামও রাখা হয়েছে বাজারের চেয়ে অনেক বেশি। রোজার মাসে বাচ্চাদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ খাবার দেওয়ার বিষয়ে অভিযোগ করলেও পান্ডামার্ট কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
ডেলিভারি সিস্টেম ও ‘রিফান্ড’ জালিয়াতি
সাদিয়া নামের এক ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা ছিল ভয়াবহ। চাঁদ রাতে আইসক্রিম অর্ডার করে ৫ ঘণ্টা পর তা হাতে পান। অনলাইন পেমেন্ট করায় রাইডার তাকে গলে যাওয়া আইসক্রিম নিতে বাধ্য করেন। পান্ডামার্টের নিয়ম অনুযায়ী, অনলাইনে টাকা দিলে পণ্য যে অবস্থায় থাকুক না কেন তা গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় রিফান্ড পাওয়া যাবে না—এমন অযৌক্তিক নিয়মকে গ্রাহকরা ‘প্রকাশ্য ডাকাতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
পর্দার আড়ালে বড় জালিয়াতি ও টাকা আত্মসাৎ
কেবল গ্রাহক নয়, সরবরাহকারীরাও (Suppliers) পান্ডামার্টের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন অভিযোগ এনেছেন।
ডকুমেন্ট জালিয়াতি: পাওনা টাকা চাইলে সরবরাহকারীদের ভুয়া নথিপত্র দেখানো এবং টাকা আত্মসাতের দায়ে মামলার আবেদন পর্যন্ত করা হয়েছে।
হুমকি ও ব্ল্যাকমেইল: পাওনাদারদের টাকা না দিয়ে উল্টো হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পান্ডামার্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
অ্যাকাউন্ট ব্লক: কোনো কারণ ছাড়াই কাস্টমার বা পার্টনারের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়ে সেখানে থাকা ব্যালেন্স আটকে রাখার ঘটনা এখন নিয়মিত।
কাস্টমার কেয়ার: সমাধানের বদলে সময়ক্ষেপণ
অধিকাংশ গ্রাহকের সাধারণ অভিযোগ হলো, পান্ডামার্টের অ্যাপ বা হেল্পলাইনে যোগাযোগ করলে কোনো কার্যকর সমাধান মেলে না। রোবটিক মেসেজ বা ‘নোট করে রাখছি’ ছাড়া তারা আর কিছুই করে না। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি কল করার কোনো সঠিক নম্বরও পাওয়া যায় না।


















