মোবাইল অপারেটর ও টেলিযোগাযোগ খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্যও বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেটে সুখবর থাকছে। বাজেটে মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা খাতে উৎসে কর কর্তনের হার ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব থাকতে পারে। মোবাইল সিমে ৩০০ টাকার নির্দিষ্ট ভ্যাট বাতিল করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের ফলে নতুন সিমের দাম কমতে পারে।
স্থানীয়ভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২২টি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম করের হার ৫ শতাংশ ও ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব থাকতে পারে। এ ছাড়া বিটিআরসির পাওয়া রেভিনিউ শেয়ার, লাইসেন্স ফি বা চার্জের ওপর প্রযোজ্য ২০ শতাংশ উৎসে কর প্রত্যাহারের প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে।
শাওমি বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার জিয়াউদ্দিন চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা শুনেছি সরকার এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি অবশ্যই সরকারের সাধুবাদ পাওয়ার মতো একটি বিষয়। সারা বিশ্ব মোবাইল ফোন খাত একটি অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এআইয়ের কারণে মেমোরি প্রাইস অনেক বেড়েছে। এই সময়টিতে আসলে আমরা যারা বাংলাদেশে মোবাইল ফোন শিল্পে বিনিয়োগ করেছি ম্যানুফ্যাকচারিং করার জন্য, আমাদের জন্য লং টার্ম সাসটেইনেবিলিটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমরা শুনেছি এবার কোনো পলিসি হচ্ছে দীর্ঘ মেয়াদের, যা বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে, আমাদের স্বস্তি দেবে। আর সরকারের এই উদ্যোগ দেশের মোবাইল ফোন শিল্পের জন্য একটি ভালো উদ্যোগ বলে আমি মনে করি।’
বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবার ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব অপারেটরদের ক্যাশ-ফ্লো উন্নত করতে এবং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে সহায়তা করতে পারে। এ ছাড়া মোবাইল ফোন উৎপাদনে ব্যবহৃত বিভিন্ন আমদানি করা যন্ত্রাংশের ওপর কর কমানোর উদ্যোগ স্থানীয় উৎপাদন, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। তবে খাতটির দীর্ঘদিনের দাবি অনুযায়ী উচ্চ করপোরেট কর হ্রাস, অবকাঠামো বিনিয়োগে বিশেষ প্রণোদনা, ৫জি সম্প্রসারণ, সফটওয়্যার রপ্তানি, ক্লাউড সেবা, ডেটা সেন্টার বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো উদীয়মান প্রযুক্তি খাতে উল্লেখযোগ্য নতুন সুবিধার কথা শোনা যাচ্ছে না। ফলে ডিজিটাল অর্থনীতি উপকৃত হলেও বড় আইসিটি ও টেলিকম কোম্পানিগুলোর জন্য বাজেটের প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত হতে পারে।’
মোবাইল ফোন ও প্রযুক্তি খাতে শুল্ক-কর সুবিধা নিয়ে বেসিসের সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর গণমাধ্যমকে বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে মোবাইল উৎপাদনের কাঁচামালে কর ছাড়ের ফলে দেশীয়ভাবে সংযোজিত কিছু ডিভাইসের দাম কমতে পারে। তবে যেসব স্মার্টফোন সরাসরি আমদানি করা হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রে তেমন কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই, কারণ আমদানি পর্যায়ের কর কাঠামোয় বড় কোনো পরিবর্তন আসার খবর পাইনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিম ট্যাক্স বা অপারেটরদের কিছু কর সুবিধা অপারেটরদের লাভ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু ভোক্তা পর্যায়ে ইন্টারনেট বা মোবাইল সেবার খরচ কমার মতো কোনো সুবিধার কথা শুনতে পারছি না।’
দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবাদাতাদের সংগঠন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বাজেটে মোবাইল অপারেটরদের যে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, তাতে প্রান্তিক জনগণ কিছুটা উপকৃত হবে, এটি ঠিক। তবে আমার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, ফিক্সড ব্রডব্যান্ড বা মানসম্মত (কোয়ালিটি) ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সম্প্রসারণে সরকার কোনো বিশেষ উদ্যোগ বা প্রণোদনা রাখছে না বলে শুনেছি। টেলিকম ও মোবাইল অপারেটরদের দিকে তাকালে দেখা যায়, দেশে বৈধ সিমের সংখ্যা প্রায় ৩২ থেকে ৩৩ কোটি। অথচ দেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। সে হিসাবে বলা যায়, এই খাত ইতোমধ্যে একটি পরিণত অবস্থায় পৌঁছেছে। তাই এ খাতে নতুন করে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার যৌক্তিকতা খুব বেশি নেই। অন্যদিকে ফিক্সড ব্রডব্যান্ড খাতে এখনো মাত্র ৮ থেকে ৯ শতাংশ পেনিট্রেশন রয়েছে। অথচ এই খাতের জন্য ভ্যাট, কর বা অন্য কোনো ধরনের প্রণোদনার খবর পাচ্ছি না। ফলে বিষয়টি অনেকটা ‘তেলে মাথায় তেল দেওয়ার’ মতো হয়েছে। যাদের শক্তিশালী লবিং সক্ষমতা রয়েছে, তারাই বেশি সুবিধা পেয়েছে।’
আইএসপিএবি সভাপতি আমিনুল হাকিম বলেন, বিটিআরসির রাজস্বসংক্রান্ত বিষয়ে উৎসে কর কর্তনের যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, সেটিরও খুব বড় কোনো প্রভাব পড়বে না। মূলত এটি অগ্রিম আয়কর (অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স) আদায়ের পদ্ধতিগত পরিবর্তন। আগে বিলের আগেই অগ্রিম উৎসে কর কেটে নিত, এখন বিল পরিশোধের সময় কেটে নেওয়া হবে। শেষ পর্যন্ত কর আদায় ঠিকই হবে, শুধু প্রক্রিয়ায় কিছু পরিবর্তন এসেছে। ফলে এর তেমন কোনো প্রভাব নেই।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের দৃষ্টিতে, দেশে মানসম্মত ও উৎপাদনশীল ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তারে সরকারের কোনো সুস্পষ্ট রোডম্যাপ নেই। ৩২-৩৩ কোটি সিমের বাজারকে আরও কীভাবে সুবিধা দেওয়া যায়, সে বিষয়ে সরকার কাজ করছে। কিন্তু কোয়ালিটি ও প্রোডাক্টিভ ইন্টারনেট সম্প্রসারণে কোনো কর ছাড়, কর অবকাশ বা বিশেষ প্রণোদনার খবর পাচ্ছি না।’




















