ডলারের ঊর্ধ্বমুখী দাম আর অতিরিক্ত শুল্কের কারণে দেশের বাজারে বৈধ মোবাইল ফোনের মূল্য সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আর এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে হুন্ডি ও অবৈধ পথে আসা চোরাচালানের ‘গ্রে মার্কেট’ বা ধূসর বাজার। বৈধ হ্যান্ডসেটের অতিরিক্ত দামের কারণে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনতে গিয়ে সাধারণ ক্রেতারা অজান্তেই পা দিচ্ছেন রিফারবিশড (ব্যবহৃত ফোন নতুনের মতো সাজানো), নকল, কপি কিংবা ক্লোন ফোনের মরণফাঁদে।
প্রযুক্তি ও বাজার সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সস্তায় পাওয়া এসব অননুমোদিত হ্যান্ডসেট শুধু যে ভোক্তাদের আর্থিক ক্ষতির মুখে ফেলছে তা নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থার শৃঙ্খলা নষ্ট করাসহ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, গত এক বছরে বৈধ চ্যানেলে আমদানিকৃত এবং দেশে সংযোজিত মাঝারি ও উচ্চ সারির স্মার্টফোনগুলোর দাম গড়ে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। চড়া বাজারের এই পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্ত ও তরুণ ক্রেতারা ঝুঁকছেন অননুমোদিত শপগুলোর দিকে। যেখানে একই মডেলের ফোন অফিশিয়াল মূল্যের চেয়ে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা কম দামে বিক্রি হচ্ছে।
তবে এই কম দামের আড়ালে লুকিয়ে আছে বড় ধরনের প্রতারণার ছক। অনেক ক্ষেত্রে নামী ব্র্যান্ডের আদলে নিখুঁত ‘ক্লোন’ বা অবিকল নকল ফোন ক্রেতাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অনেক সময় বিদেশ থেকে আসা স্ক্র্যাপ বা নষ্ট ফোন মেরামত করে ‘ইনট্যাক্ট’ বা নতুন মোড়কে রিফারবিশড হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে।
মোবাইল ফোন ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এমআইওবি)-এর প্রতিনিধিরা এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে জানিয়েছেন, চোরাই পথে আসা এবং আইএমইআই (IMEI) জাল করা এসব হ্যান্ডসেটের কারণে সাধারণ ক্রেতারা চরমভাবে প্রতারিত হচ্ছেন।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এসব অবৈধ ডিভাইসের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ওয়ারেন্টি বা নির্ভরযোগ্য বিক্রয়োত্তর সেবা (আফটার সেলস সার্ভিস) থাকে না। ফলে ক্রয়ের কয়েকদিনের মধ্যে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে গ্রাহকের আর কিছু করার থাকে না।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো ক্লোন ও অনিবন্ধিত ফোনগুলোর অপব্যবহার। অপরাধীরা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অত্যন্ত সহজে এসব ট্র্যাকিংবিহীন বা ডুপ্লিকেট আইএমইআই যুক্ত ফোন ব্যবহার করছে। একই আইএমইআই নম্বরে একাধিক ক্লোন ডিভাইস সচল থাকায় কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ ও ডিজিটাল নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে স্যামসাং, শাওমি, রিয়েলমি ও ভিভোর মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো স্থানীয় অংশীদারদের সাথে মিলে বিশাল বিনিয়োগে আধুনিক মোবাইল সংযোজন কারখানা স্থাপন করেছে। তবে অবৈধ গ্রে মার্কেটের অসম প্রতিযোগিতার কারণে এই দেশীয় শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, চোরাচালান ও ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আসা ফোনগুলোর কারণে বৈধ আমদানিকারক ও স্থানীয় উৎপাদকেরা অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছেন। শুল্ক পরিশোধ না করায় গ্রে মার্কেটের বিক্রেতারা কম দামে ফোন বিক্রি করতে পারছে, যা বৈধ করদাতা ব্যবসায়ীদের বিক্রি কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন দেশীয় শিল্প হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে সরকার প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
এই চোরাই ও ক্লোন পণ্যের বাজার যেকোনো মূল্যে বন্ধ করতে ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন:
সীমান্তে কঠোর নজরদারি: চোরাই পথে হ্যান্ডসেট প্রবেশ ঠেকাতে দেশের সীমান্ত ও বন্দরগুলোতে শুল্ক গোয়েন্দা ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর নজরদারি এবং তল্লাশি আরও জোরদার করতে হবে।
ট্যাক্স কাঠামো যৌক্তিকীকরণ: বৈধ ফোনের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ফিরিয়ে আনতে আমদানি শুল্ক এবং ভ্যাট কাঠামোকে একটি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত পর্যায়ে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। শুল্ক কমলে চোরাচালানের প্রবণতা আপনা-আপনি হ্রাস পাবে।
এনইআইআর (NEIR) ব্যবস্থার কঠোর বাস্তবায়ন: দেশের বাজারে সচল প্রতিটি হ্যান্ডসেটের আইএমইআই ডাটাবেজ বা ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) ব্যবস্থা পুরোপুরি সক্রিয় করা এবং অনিবন্ধিত ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন করার প্রক্রিয়া কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এখনই যদি অবৈধ হ্যান্ডসেটের বাজার নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে বৈধ স্মার্টফোন খাত অচিরেই ধসে পড়বে; যার খেসারত দিতে হবে সাধারণ ভোক্তা, দেশীয় শিল্প এবং সরকারি কোষাগারকে।


















