যুক্তরাষ্ট্রে আরো ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বের শীর্ষ এআই চিপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি (টিএসএমসি)।
দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) রেকর্ড মুনাফার খবরের পর পরই এমন বড় বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চিপের বিশ্বব্যাপী আকাশচুম্বী চাহিদাকে পুঁজি করে টিএসএমসি তাদের ব্যবসার পরিধি আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। খবর রয়টার্স।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে আসছেন। টিএসএমসির এ বিশাল বিনিয়োগকে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে অ্যারিজোনায় কোম্পানিটির মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে। এটি কেবল চিপ তৈরির কারখানা হিসেবেই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে এবং হাজার হাজার উচ্চ বেতনের প্রযুক্তিগত চাকরির সুযোগ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর আগে রাজ্যটিতে চিপ তৈরির কারখানা স্থাপনের জন্য ১৬ কোটি ৫০ লাখ ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।
কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সিসি ওয়ে জানিয়েছেন, এআই প্রযুক্তির ওপর মানুষের নির্ভরতা দিন দিন বাড়ছে। এ ধারা আগামী কয়েক বছর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে বলে তারা আশাবাদী। অ্যাপল ও এনভিডিয়ার মতো বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো টিএসএমসির গ্রাহক। তারা এখন তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে কোম্পানিটিকে তাগিদ দিচ্ছে। এ চাহিদাকে সামনে রেখেই টিএসএমসি চলতি বছরের মূলধনি ব্যয় বা ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার পরিকল্পনা প্রায় ১৪ শতাংশ বাড়িয়ে ৬ হাজার থেকে ৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলারে উন্নীত করেছে।
এদিকে সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনে টিএসএমসির রেকর্ড মুনাফার চিত্র ফুটে উঠেছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে কোম্পানিটির নিট মুনাফা ৭৭ শতাংশ বেড়ে প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি ডলারে (৭০ হাজার ৬৬০ কোটি তাইওয়ানিজ ডলার) পৌঁছায়, যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। ধারাবাহিকভাবে ৯ প্রান্তিক ধরে কোম্পানিটি এমন দ্বিগুণ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, যা প্রযুক্তি বিশ্বে কোম্পানিটির একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রমাণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে এআই চিপের ক্ষেত্রে ৩ ও ২ ন্যানোমিটার প্রযুক্তির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, যার বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য টিএসএমসির। এছাড়া এআই অবকাঠামোর জন্য অত্যাবশ্যকীয় ‘কোউওএস’ প্যাকেজিং প্রযুক্তির চাহিদাও তুঙ্গে, যার মূল সরবরাহকারী টিএসএমসি। এসব কারণে বাজারে কোম্পানিটির মোট মূল্য এখন প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা তাদের মূল দক্ষিণ কোরীয় প্রতিদ্বন্দ্বী স্যামসাং ইলেকট্রনিকসের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।
বাজারে চিপের অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে ভবিষ্যতে কোনো সংকট তৈরি হতে পারে কিনা, এমন আশঙ্কার জবাবে সিইও সিসি ওয়েই স্পষ্ট করেন, তারা শুধু গ্রাহকের চাহিদার ওপর অন্ধভাবে নির্ভর করেন না। চিপের বাড়তি মজুদ বা অপচয় রোধ করতে টিএসএমসি নিজস্ব উদ্যোগে ডেটা সেন্টার নির্মাণ এবং বিশ্ববাজারের প্রবণতা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণা পরিচালনা করে।
তিনি আরো জানান, বাজারে বর্তমানে ‘এজেন্টিক এআই’ (এমন এআই, যা নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারে) ব্যবস্থার উত্থানের কারণে ডেটা সেন্টারগুলোয় প্রথাগত সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট বা সিপিইউর চাহিদাও নতুন করে বাড়ছে, যা চিপের বাজারে বাড়তি গতি এনেছে।
বাজারের এ চাহিদার কথা মাথায় রেখে টিএসএমসি অ্যারিজোনায় আরো চারটি কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এতে উন্নত প্যাকেজিং সুবিধাও যুক্ত থাকবে। তবে এ কারখানাগুলোর নির্মাণকাল নির্ভর করবে বাজারের পরিস্থিতির ওপর। এর আগে অ্যারিজোনায় টিএসএমসির আটটি কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছিল। নতুন করে এ বিশাল বিনিয়োগের মাধ্যমে কোম্পানিটি এআই বিপ্লবের কারণে তৈরি হওয়া চিপের অভাব যেন বাজারে তৈরি না হয় তা নিশ্চিত করতে চায়।
এদিকে চিপ তৈরির সরঞ্জামের প্রধান সরবরাহকারী ডাচ কোম্পানি এএসএমএল জানিয়েছে, তারাও নিজেদের ২০২৬ সালের বিক্রয় পূর্বাভাস বাড়িয়েছে। এটি প্রযুক্তি খাতে আশার আলো দেখাচ্ছে, কারণ সরঞ্জাম সরবরাহের সীমাবদ্ধতা চিপ উৎপাদনকে বাধাগ্রস্ত করছিল।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, টিএসএমসির শেয়ারের দাম চলতি বছরের শুরু থেকে ৫৯ শতাংশ বেড়েছে। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ থেকে শুরু করে জটিল এআই ডেটা সেন্টার—সবখানেই এখন উন্নত চিপের প্রয়োজন। এ চিপ তৈরির জন্য বিশ্বের একমাত্র ভরসার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাইওয়ানের এ কোম্পানিটি।




















