মোবাইল টাওয়ারের তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণ বা ইএমএফ নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী (অব.)। একই সঙ্গে রংপুরের ১১টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ইএমএফ বিকিরণ ও মোবাইল নেটওয়ার্কের সেবার মান (কিউওএস) পরিমাপ করেছে বিটিআরসি।
মঙ্গলবার সকালে রংপুর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ‘মোবাইল টাওয়ারের ইএমএফ রেডিয়েশন পরিবীক্ষণ, জনসচেতনতা ও কিউওএস উন্নয়ন’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, মোবাইল টাওয়ার স্থাপনে কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন এবং অনুমতি ছাড়া টাওয়ার স্থাপনের সুযোগ নেই। টাওয়ারের রেডিয়েশন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হলেও এ বিষয়ে সঠিক তথ্য তুলে ধরে জনসচেতনতা বাড়াতে বিটিআরসি কাজ করছে।
তিনি বলেন, টাওয়ারের রেডিও সিগন্যাল ও পাওয়ার কারিগরি বিষয়। তাই এ বিষয়ে প্রচলিত ধারণার পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এবং নির্ধারিত মান বজায় রাখা জরুরি। বাড়ির ছাদে টাওয়ার স্থাপনের ক্ষেত্রেও অনুমোদিত নিয়ম ও নির্ধারিত মান অনুসরণ করতে হয়। টাওয়ারের সংখ্যা বা অবস্থান নিয়ে যেসব প্রশ্ন রয়েছে, সেগুলোও কারিগরি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা হচ্ছে।
রংপুরে ১১ স্থানে ইএমএফ পরিমাপ
বিটিআরসির কারিগরি বিশেষজ্ঞ দল ৮ থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত রংপুর শহর ও আশপাশের এলাকায় ইএমএফ বিকিরণ পরিমাপ করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকা, বাজার-বাণিজ্যিক এলাকা এবং টাওয়ারসংলগ্ন স্থাপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
পরিমাপের স্থানগুলোর মধ্যে গ্রান্ড প্যালেস হোটেল, ক্যান্টনমেন্ট রোড, শাপলা মোড়, আলমনগর, শ্যামলী টেকনিক্যাল কলেজ, রেলওয়ে স্টেশন, তাজহাট বাজার, তাজহাট জমিদারবাড়ি, টাউন হল ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের কার্যালয় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক কমিশন অন নন-আয়োনাইজিং রেডিয়েশন প্রোটেকশন (আইসিএনআইআরপি) অনুযায়ী রেডিয়েশনের নিরাপদ সীমা ৬১ ভোল্ট পার মিটার (ভি/এম)। বিটিআরসির পরিমাপে রংপুরের গ্রান্ড প্যালেস হোটেল এলাকায় সর্বোচ্চ ১ দশমিক ৭৯৫ ভি/এম এবং গড় ১ দশমিক ০৮২ ভি/এম পাওয়া গেছে। ক্যান্টনমেন্ট রোডে সর্বোচ্চ মান ছিল ১০ দশমিক ৪৮০ ভি/এম এবং রেলওয়ে স্টেশনে মাত্র ০ দশমিক ৪৭৪ ভি/এম। জেলার অন্য কোনো পরিমাপস্থলে বিকিরণের মাত্রা ১১ ভি/এম ছাড়ায়নি।
কিউওএস পরীক্ষায় ফোরজির গতি লক্ষ্যমাত্রার ওপরে
ইএমএফ পরিমাপের পাশাপাশি রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কের কিউওএসও পরীক্ষা করে বিটিআরসির কারিগরি দল।
বিটিআরসির উপস্থাপিত বেঞ্চমার্ক অনুযায়ী, ২জি ভয়েস-মসের মান ৩ দশমিক ৫-এর বেশি হওয়ার কথা। পরিমাপে গড় মান পাওয়া গেছে ৩ দশমিক ৮৭। তবে ৪জি ভয়েস-মসের গড় ৩ দশমিক ৪২ এবং ৪জি ভিওএলটিই ভয়েস-মসের গড় ৩ দশমিক ০৭ পাওয়া গেছে। ভয়েস-মস মোবাইল নেটওয়ার্কে ভয়েস কলের শ্রুতিযোগ্যতা ও কথোপকথনের গুণগত মানের একটি সূচক।
৪জি ডাউনলিংক থ্রুপুটের বেঞ্চমার্ক ১০ এমবিপিএসের বেশি হলেও পরিমাপে গড় গতি পাওয়া গেছে ২৩ দশমিক ৩৯ এমবিপিএস। অন্যদিকে, আপলিংক থ্রুপুটের বেঞ্চমার্ক ২ এমবিপিএসের বেশি হলেও গড় গতি পাওয়া গেছে ১২ দশমিক ৯৪ এমবিপিএস। ডাউনলিংক হলো বেস স্টেশন থেকে ব্যবহারকারীর ডিভাইসে ডেটা পৌঁছানোর হার, আর আপলিংক হলো ব্যবহারকারীর ডিভাইস থেকে বেস স্টেশনে ডেটা পাঠানোর হার।
ইন্টারনেট ব্যবহার ও এআই নিয়ে সচেতনতার আহ্বান
গ্রাহকের ইন্টারনেট ব্যবহার প্রসঙ্গে এমদাদ উল বারী বলেন, একজন গ্রাহক নির্দিষ্ট পরিমাণ ডেটা কিনে কীভাবে ব্যবহার করবেন, তা তাঁর প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে। গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজ রয়েছে, সীমাহীন ইন্টারনেট সুবিধার প্যাকেজও আছে। তবে সেবার মান ও গ্রাহকের অধিকার নিশ্চিত করাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল দায়িত্ব। নেটওয়ার্কের মান, গ্রাহকসেবা ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে ইন্টারনেট-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে বিটিআরসি একাধিক স্তরে কাজ করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বন্ধ করে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; বরং প্রযুক্তি ব্যবহারে মানুষের সচেতনতা বাড়াতে হবে। বর্তমানে এআই ব্যবহার করে ভুয়া ভিডিও ও ছবি তৈরি করা হচ্ছে, ফলে সত্য তথ্য নিয়েও মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ব্যক্তি পর্যায়েও দায়িত্বশীল হতে হবে।
শিশু-কিশোরদের গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে অভিভাবকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শিশুদের প্রযুক্তি ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া সমাধান নয়। তবে সন্তানরা কী ধরনের গেম খেলছে বা কনটেন্ট দেখছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের নজর রাখতে হবে এবং অতিরিক্ত মোবাইল আসক্তি থেকেও তাদের দূরে রাখতে হবে।
সভায় বিটিআরসির ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড অপারেশন্স বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আজম পারভেজসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। রংপুর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন। বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার, স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের প্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এতে অংশ নেন।





















