দেশের মোবাইল আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশের বিভিন্ন সেবা ও নীতিমালা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। গ্রাহক ও এজেন্টদের করা এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে এনপিএসবি ও বাংলা কিউআর সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়া, অ্যাকাউন্ট স্থগিত, অতিরিক্ত চার্জ, ঋণসেবা নিয়ে অসন্তোষ এবং এজেন্টদের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়ার অভিযোগ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগের ভিত্তিতে এসব দাবি সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হস্তক্ষেপও চেয়েছেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বিকাশের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এনপিএসবি ও বাংলা কিউআর নিয়ে অভিযোগ
বিকাশ থেকে ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে এনপিএসবি সুবিধা নিয়ে একাধিক গ্রাহক অভিযোগ করেছেন। তাঁদের দাবি, এনপিএসবির মাধ্যমে লেনদেন করার পর কোনো কোনো অ্যাকাউন্টে এ সেবা বন্ধ বা স্থগিত করা হয়েছে।
আহমেদ তানভীর নামে একজন অভিযোগ করেন, এনপিএসবির মাধ্যমে ব্যাংকে অর্থ পাঠানোর খরচ তুলনামূলক কম হলেও ওই সেবা বন্ধ থাকায় গ্রাহকদের বিকাশের নিজস্ব ‘বিকাশ টু ব্যাংক’ সুবিধা ব্যবহার করতে হচ্ছে।
বাংলা কিউআর ব্যবহার নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন গ্রাহক। তাঁদের দাবি, বাংলা কিউআরের মাধ্যমে লেনদেনের পর কোনো কোনো অ্যাকাউন্টে পেমেন্ট বা কিউআর সুবিধা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এজেন্টদের ওপর চাপ দেওয়ার অভিযোগ
বিকাশের এজেন্টদের একটি অংশ অভিযোগ করেছেন, বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে তাঁদের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হয়।
শেখ আল মামুন ও বালায়েত হোসেনের অভিযোগ, মাস শেষ হওয়ার আগে বড় অঙ্কের টার্গেট দেওয়া হয়। তা পূরণ করতে নিজেদের বা স্বজনদের অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দিয়ে লক্ষ্য পূরণ করতে হয় বলেও তাঁরা দাবি করেছেন।
আরও কয়েকজন এজেন্টের অভিযোগ, তাঁদের ১০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত সঞ্চয় বা ডিপিএস খোলার জন্য চাপ দেওয়া হয়। এতে রাজি না হলে এজেন্টশিপ বা নির্দিষ্ট সেবা বন্ধের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
কয়েকজন এজেন্ট আবার দোকানে বাংলা কিউআর রাখার বিষয়েও বিকাশ প্রতিনিধিদের চাপের অভিযোগ করেছেন।
ঋণসেবা নিয়েও প্রশ্ন
বিকাশের ঋণসেবা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। মাকসাদুল মুনতাসির নামে একজন জানতে চেয়েছেন, নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ঋণ পরিশোধ করলেও কেন পুরো মেয়াদের চার্জ বা লভ্যাংশ কেটে নেওয়া হয়।
অন্যদিকে কয়েকজন গ্রাহক মোবাইল হারানো বা প্রতারণার মাধ্যমে তাঁদের নামে ঋণ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন। এসব ক্ষেত্রে নিরাপত্তাব্যবস্থা ও গ্রাহক যাচাই নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
কেউ কেউ আবার ঋণ পরিশোধে দেরি হওয়ার পর অ্যাপে ঋণ নেওয়ার সুবিধা আর দেখতে না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
ক্যাশ-আউট ও অন্যান্য চার্জ নিয়ে অসন্তোষ
বিকাশের ক্যাশ-আউট ও সেন্ড মানি চার্জ নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গ্রাহকদের একটি অংশ।
তাঁদের কেউ কেউ ক্যাশ-আউটের বর্তমান খরচকে বেশি বলে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য পেমেন্টে অতিরিক্ত চার্জ এবং লিংকড সেবার মাধ্যমে গ্রাহকের অজান্তে অর্থ কেটে নেওয়ার অভিযোগও এসেছে।
কয়েকজন ব্যবহারকারী আবার ব্যাংক হিসাবে টাকা স্থানান্তরের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংক না থাকার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
অ্যাকাউন্ট ব্লক ও প্রতারণার অভিযোগ
ভুল নম্বরে অর্থ চলে যাওয়া, অ্যাকাউন্ট বা মার্চেন্ট হিসাব বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কাস্টমার কেয়ারে যোগাযোগ করেও সমাধান না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
মো. মাশুদ হোসেন নামে একজন দাবি করেছেন, বন্ধ সিমের নম্বরে ভুল করে টাকা পাঠানোর পর অর্থ ফেরত পেতে তিনি জটিলতার মুখে পড়েছেন।
আরও কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা ছাড়াই তাঁদের মার্চেন্ট বা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয়েছে। ই-মেইল ও গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে যোগাযোগ করেও দ্রুত সমাধান পাওয়া যায়নি বলে তাঁদের দাবি।
এ ছাড়া বিকাশের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অনলাইন জুয়া বা অবৈধ লেনদেনের অভিযোগও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি।
তদন্তের দাবি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এসব অভিযোগের পর বিকাশের সেবা ও ব্যবসায়িক নীতিমালা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি বাড়ানোর দাবি উঠেছে।
সাজিদ হাসান, সানিম হাসান ও সচেতন ভোক্তা সমাজের (CCS) পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে বলে অভিযোগগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, গ্রাহক ও এজেন্টদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে বিকাশের বিভিন্ন সেবা, চার্জ, অ্যাকাউন্ট স্থগিতের প্রক্রিয়া এবং এজেন্টদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি কোনো অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।





















