বেসরকারি খাতের মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসিতে প্রায় ১৯৪ কোটি ৭৩ লাখ টাকা অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা বা সিএসআর তহবিলের অর্থে কম্বল কেনা, ডায়েরি-ক্যালেন্ডার সরবরাহ এবং বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্পে ব্যয়ের ক্ষেত্রে এসব অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি হারে পরিচালনা পর্ষদ ও নির্বাহী কমিটির সভার সম্মানী দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট-২-এর একটি নথিতে এসব অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
কম্বল কেনায় ১১০ কোটি টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সিএসআর তহবিল থেকে কম্বল কেনার নামে প্রায় ১১০ কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান, সাতজন পরিচালক এবং শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। একজন পরিচালককে কেন্দ্র করে কম্বল কেনার প্রক্রিয়া পরিচালিত হওয়ার কথাও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডায়েরি-ক্যালেন্ডারে ৭৭ কোটি ৭৩ লাখ
ডায়েরি ও ক্যালেন্ডার সরবরাহের নামেও প্রায় ৭৭ কোটি ৭৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালেও বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষকের উপস্থিতিতে একই ধরনের অনিয়ম অব্যাহত ছিল। ফলে এসব ব্যয় ও ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
৮ হাজারের বদলে সভাপ্রতি সম্মানী ১ লাখ টাকা
পর্ষদ ও নির্বাহী কমিটির সভার সম্মানী নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী, পর্ষদ বা নির্বাহী কমিটির প্রতিটি সভায় একজন সদস্যের সম্মানী ৮ হাজার টাকা। কিন্তু মার্কেন্টাইল ব্যাংকে প্রতি সভায় ১ লাখ টাকা করে সম্মানী দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নথিতে বলা হয়েছে, নিয়মের অতিরিক্ত অর্থ ‘সাসপেন্স আদার্স অ্যাকাউন্ট’ থেকে উত্তোলন করা হয়। পরে ভুয়া বিল ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে এসব অর্থ সমন্বয় করার অভিযোগ রয়েছে।
নথিতে ঘটনাটিকে আর্থিক জালিয়াতি ও ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কোম্পানি সচিবের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও রয়েছে।
আইটি প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগ
ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য ‘থাকরল ইনফরমেশন কোম্পানি’কে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এ কাজের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রয়নীতিও মানা হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাংকের ‘রেইনবো অ্যাপ’ উন্নয়ন নিয়েও ব্যয়ের অসংগতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নথি অনুযায়ী, ‘কোনা সফটওয়্যার ল্যাব’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে রেইনবো অ্যাপের জন্য ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে কারওয়ান বাজার শাখার একটি হিসাব থেকে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা ডেবিট করা হয়।
কার্যাদেশের অর্থের সঙ্গে প্রকৃত ব্যয়ের এত বড় ব্যবধানের যৌক্তিকতা পাওয়া যায়নি বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনিয়মের প্রতিবাদ করায় চাকরিচ্যুতির অভিযোগ
আইটি প্রকল্পের কথিত অনিয়মের প্রতিবাদ করায় ব্যাংকের একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগও রয়েছে। একই ঘটনায় ব্যাংকের আইটি বিভাগের প্রধানকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
এসব অভিযোগের ঘটনায় মার্কেন্টাইল ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মতিউল হাসান, পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল আওয়াল এবং কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার নাম এসেছে।
অভিযোগকারী ঘটনাগুলোকে পরিকল্পিত অর্থ আত্মসাৎ ও অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং তদন্তে অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপ
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক সুপারভিশন ডিপার্টমেন্ট-২ এসব অভিযোগের সারসংক্ষেপ তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানোর কথা জানিয়েছে।
এখন অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, অর্থের প্রকৃত ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের দায় নির্ধারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর থাকবে।






















