স্থানীয়ভাবে এসি, ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদনে সরকার যে রেয়াতি শুল্ক-কর সুবিধা দিচ্ছে, তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে চীনা প্রতিষ্ঠান হায়ার বাংলাদেশ লিমিটেডের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় উৎপাদনের শর্তে শুল্ক-কর সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সম্পূর্ণ তৈরি এসি, ফ্রিজ ও ওয়াশিং মেশিন আমদানি করছে। এমনকি ক্যাপিটাল মেশিনারিজ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ভিআরএফ (Variable Refrigerant Flow) এসি আমদানি ও খালাসেরও অভিযোগ রয়েছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সরকার একদিকে সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে, অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদনে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে।
তারা হায়ার বাংলাদেশের আমদানি নথি, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও কমার্শিয়াল ইম্পোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (IRC), উৎপাদন সক্ষমতা, বিল অব এন্ট্রি এবং রেয়াতি সুবিধা গ্রহণের শর্ত পূরণের বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগ অস্বীকার করে হায়ার বাংলাদেশ জানিয়েছে, তারা সরকারের নির্ধারিত নিয়ম ও সংশ্লিষ্ট এসআরও মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করছে।
স্থানীয় উৎপাদনের শর্তে রেয়াতি সুবিধা
দেশে এসি ও গৃহস্থালি পণ্যের স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে সরকার বিভিন্ন সময়ে শুল্ক ও ভ্যাটে রেয়াতি সুবিধা দিয়ে আসছে। এর লক্ষ্য স্থানীয় উৎপাদন, প্রযুক্তি স্থানান্তর, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আমদানিনির্ভরতা কমানো।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসি উৎপাদনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্টের মধ্যে অন্তত তিনটি স্থানীয়ভাবে উৎপাদনের সক্ষমতা থাকার শর্ত রয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ইনডোর ইউনিট, আউটডোর ইউনিট, কনডেনসর, এভাপোরেটর এবং সাকশন অ্যান্ড ডিসচার্জ পাইপ।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোনো প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা নেওয়ার পর একই পণ্যের গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্ট বা সম্পূর্ণ তৈরি পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করলে রেয়াতি সুবিধার শর্ত পরিপালন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
তাদের দাবি, হায়ার বাংলাদেশ স্থানীয় উৎপাদনের জন্য সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি এসব কম্পোনেন্টের উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় আমদানি করেছে।
তবে এই অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আমদানি নথির পাশাপাশি কারখানার প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা ও সংশ্লিষ্ট এসআরওর শর্ত যাচাই প্রয়োজন।
একই প্রতিষ্ঠানের দুই ধরনের আইআরসি ব্যবহারের অভিযোগ
হায়ার বাংলাদেশের আমদানি-সংক্রান্ত নথিতে একই ই-টিআইএন ও ঠিকানার অধীনে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইম্পোর্ট রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (Industrial IRC) এবং কমার্শিয়াল IRC ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, স্থানীয় উৎপাদনকারী হিসেবে ইন্ডাস্ট্রিয়াল আইআরসির আওতায় শুল্ক সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি একই প্রতিষ্ঠানের কমার্শিয়াল আইআরসি ব্যবহার করে সম্পূর্ণ তৈরি পণ্য আমদানি করা হয়েছে কি না।
এ ক্ষেত্রে কোন পণ্যের ক্ষেত্রে কোন আইআরসি ব্যবহার করা হয়েছে, কী ধরনের শুল্ক সুবিধা নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট পণ্য রেয়াতি সুবিধার শর্তের আওতায় পড়ে কি না—তা বিল অব এন্ট্রি, আইআরসি এবং কাস্টমসের নথি মিলিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ক্যাপিটাল মেশিনারিজে ৯৮টি রেডিমেড এসি
২০২৪ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত হায়ার বাংলাদেশের আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে চীন থেকে ৩ লাখ BTU ক্ষমতার সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এগুলোর মধ্যে ভিআরএফ ধরনের এসিও রয়েছে।
এই সময়ে মোট ৯৮টি রেডিমেড সেন্ট্রাল এসি আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ হলো, এসব পণ্য ক্যাপিটাল মেশিনারিজ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে খালাস করা হয়েছে।
শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ক্যাপিটাল মেশিনারি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে সরকার বিশেষ শুল্ক সুবিধা দিয়ে থাকে। ফলে কোনো সম্পূর্ণ তৈরি ও সরাসরি বিক্রয়যোগ্য এসিকে ক্যাপিটাল মেশিনারি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তবে কোনো পণ্য ক্যাপিটাল মেশিনারি হিসেবে শুল্ক সুবিধা পাওয়ার যোগ্য কি না, তা পণ্যের প্রকৃতি, আমদানির ঘোষণা এবং সংশ্লিষ্ট শুল্ক শ্রেণিবিন্যাসের নথি যাচাই করেই নির্ধারণ করা সম্ভব।
ফ্রিজ ও কম্প্রেসরও আমদানি
এসি ছাড়াও হায়ার বাংলাদেশ ৩৬৯ লিটার ধারণক্ষমতার ১৪৮টি চেস্ট ফ্রিজার আমদানি করেছে বলে আমদানি তথ্য থেকে জানা গেছে।
এ ছাড়া আমদানি করা হয়েছে ৪৪৮টি এসি কম্প্রেসর এবং ৪৪৮টি এসি মোটর।
এসব পণ্য কী উদ্দেশ্যে এবং কোন ধরনের আইআরসি ও শুল্ক সুবিধার আওতায় আমদানি করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।
তিন বছরে ৪৫ হাজারের বেশি ওয়াশিং মেশিন
হায়ার ব্র্যান্ডের ওয়াশিং মেশিন আমদানিতেও বড় পরিমাণের তথ্য পাওয়া গেছে।
২০২৩ সাল থেকে চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ৭ থেকে ১৪ কেজি ধারণক্ষমতার বিভিন্ন মডেলের মোট ৪৫ হাজার ৬৪টি ওয়াশিং মেশিন আমদানি করেছে প্রতিষ্ঠানটি বলে সংশ্লিষ্ট আমদানি তথ্যের বরাতে দাবি করা হয়েছে।
বছরভিত্তিক হিসাবে—
২০২৩: ১০ হাজার ৮১৭টি
২০২৪: ৭ হাজার ৫২২টি
২০২৫: ২০ হাজার ৪৬১টি
২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত: ৬ হাজার ২৬৪টি
সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে ২০২৫ সালে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, স্থানীয় উৎপাদনের জন্য নির্ধারিত সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি এত বিপুল পরিমাণ সম্পূর্ণ তৈরি ওয়াশিং মেশিন আমদানি করা হলে তা সরকারের স্থানীয় শিল্পায়ন নীতির উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
স্থানীয় উৎপাদনকারীদের জন্য অসম প্রতিযোগিতার আশঙ্কা
দেশের এসি, ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদনকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলেন, স্থানীয় উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারখানা, উৎপাদন লাইন, যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করতে হয়।
অন্যদিকে কোনো প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে রেয়াতি সুবিধা নিয়ে সম্পূর্ণ তৈরি পণ্য আমদানি ও বাজারজাত করলে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের তুলনামূলক বেশি ব্যয়ে উৎপাদন করতে হতে পারে।
তাদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে দেওয়া নীতি-সুবিধার কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
তবে এ অভিযোগের নিষ্পত্তি প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের ভিত্তিতে নয়; আমদানি নথি, উৎপাদন রেকর্ড, কারখানার সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট এসআরওর শর্ত যাচাইয়ের মাধ্যমে হওয়া উচিত বলে মনে করছেন শিল্প বিশ্লেষকরা।
‘শর্ত ভঙ্গ হলে ব্যবস্থা’
অভিযোগের বিষয়ে এনবিআরের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বাড়াতে এসি, ফ্রিজ ও গৃহস্থালি পণ্য উৎপাদনে সরকার রেয়াতি সুবিধা দিয়ে থাকে।
তার ভাষ্য, এসব সুবিধার অন্যতম শর্ত হলো স্থানীয়ভাবে পণ্য উৎপাদন করা। কোনো প্রতিষ্ঠান এসআরওর শর্ত ভেঙে কাঁচামাল বা যন্ত্রপাতির নামে সম্পূর্ণ তৈরি পণ্য আমদানি করে সুবিধা নিলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
হায়ার বাংলাদেশ এমন কোনো সুবিধা শর্ত ভঙ্গ করে নিয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানান তিনি।
ফিনিশড গুডসকে ক্যাপিটাল মেশিনারিজ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে শুল্ক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়েও তিনি বলেন, পণ্যের প্রকৃতি ও আমদানি নথি যাচাই করে বিষয়টি নির্ধারণ করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট ভ্যাট কমিশনারেট বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে।





















