মোবাইল অপারেটরদের তরঙ্গ নবায়নে একের পর এক আর্থিক সুবিধার প্রস্তাব দিচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। কমানো হচ্ছে তরঙ্গের দাম, বাড়ানোর সুপারিশ করা হচ্ছে মূল্য পরিশোধের কিস্তি এবং লাইসেন্সের মেয়াদ। এর মধ্যেই ১৫ বছরের জন্য নির্ধারিত দামেই ২০ বছরের লাইসেন্স, ২০ বছর ধরে কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ এবং বার্ষিক চার্জ প্রত্যাহারের দাবি তুলেছে বেসরকারি মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এমটব)।
অন্যদিকে, নিম্নমানের নেটওয়ার্ক, কলড্রপ ও ধীরগতির ইন্টারনেট নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগের অবসান হচ্ছে না। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোবাইল সেবার মান নিয়ে ৪ হাজার ১৬২টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যা ওই অর্থবছরে মোবাইল সেবা নিয়ে করা ২৩ ধরনের অভিযোগের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এমন পরিস্থিতিতে তরঙ্গ নবায়নে অপারেটরদের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নে সুনির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করা হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, তরঙ্গের মূল্য ও পরিশোধের শর্তে ছাড় দেওয়া হলে তার বিপরীতে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, সেবার মান উন্নয়ন এবং গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার কার্যকর অঙ্গীকারও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
১৫ বছরের দামে ২০ বছরের লাইসেন্স চায় এমটব
আগামী ১০ নভেম্বর গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের হাতে থাকা মোট ৭৯ দশমিক ২ মেগাহার্টজ তরঙ্গের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এসব তরঙ্গ নবায়নের জন্য প্রথমবারের মতো গবেষণার ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে বিটিআরসি।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত মূল্য চূড়ান্ত করার সুপারিশ জানিয়ে ১৫ অক্টোবর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে চিঠি পাঠায় কমিশন। এতে ১৫ বছরের জন্য প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গের দাম ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ২৩৭ কোটি টাকা, ১৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ১৯৮ কোটি টাকা এবং ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ১৭২ কোটি টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। এসব দাম আগের তুলনায় গড়ে সর্বোচ্চ প্রায় ৩০ শতাংশ কম বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রাথমিক প্রস্তাবে তরঙ্গের মূল্য আটটি কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছিল। তবে অপারেটরদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২২ অক্টোবর সংশোধিত প্রস্তাব পাঠায় বিটিআরসি। এতে লাইসেন্সের মেয়াদ ১৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ২০ বছর এবং কিস্তির সংখ্যা আটটি থেকে বাড়িয়ে ১২টি করার সুপারিশ করা হয়।
এরপরও সন্তুষ্ট নয় অপারেটরদের সংগঠন এমটব। ২৫ অক্টোবর বিটিআরসি চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারীকে পাঠানো চিঠিতে সংগঠনটি ১৫ বছরের জন্য নির্ধারিত দামেই ২০ বছরের লাইসেন্স, ২০ বছর ধরে কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ এবং তরঙ্গ নবায়নের বার্ষিক চার্জ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন এমটবের মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার।
এমটবের এসব দাবি গৃহীত হলে সরকারের রাজস্ব আয় এবং অপারেটরদের আর্থিক সুবিধার মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে। সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, ১৫ বছরের জন্য নির্ধারিত মূল্যেই ২০ বছরের মেয়াদ দেওয়া হলে প্রস্তাবিত কাঠামোর তুলনায় সরকারের সম্ভাব্য আয় ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি কমতে পারে। তবে এই হিসাবের ভিত্তি, বার্ষিক চার্জের আর্থিক প্রভাব এবং চূড়ান্ত মূল্যকাঠামো সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
কিস্তি ও নবায়নের শর্ত কেন বারবার বদলাচ্ছে?
বিটিআরসির ৩১২তম কমিশন সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের বিভিন্ন সময়ে তরঙ্গ বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে সর্বোচ্চ ১০টি কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন বরাদ্দের ক্ষেত্রেও কিস্তির সুবিধা রাখার প্রস্তাব করা হয়।
সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, একটি লাইসেন্সের মেয়াদ ২০৩৯ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত থাকায় প্রাথমিক প্রস্তাবে অবশিষ্ট ১২ বছর চার মাসের জন্য তরঙ্গ বরাদ্দ এবং আটটি সমান কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের কথা বলা হয়েছিল। প্রথম কিস্তি নবায়নের নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে, দ্বিতীয় কিস্তি পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে এবং বাকি ছয়টি পরবর্তী বছরগুলোতে পরিশোধের প্রস্তাব ছিল।
পরবর্তী সময়ে লাইসেন্সের মেয়াদ ও কিস্তির সংখ্যা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এসব পরিবর্তনের পেছনে অপারেটরদের আর্থিক সক্ষমতা, বিনিয়োগের প্রয়োজন এবং সরকারের রাজস্ব স্বার্থ কীভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরঙ্গ বরাদ্দের মূল্য নির্ধারণে গবেষণাভিত্তিক পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও একই সঙ্গে নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং সরকারি সম্পদের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষ করে মেয়াদ ও কিস্তির শর্তে পরিবর্তন আনলে তার আর্থিক প্রভাব প্রকাশ করা উচিত।
ছাড়ের বিপরীতে সেবার মান বাড়ানোর শর্ত কোথায়?
তরঙ্গ মোবাইল নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। পর্যাপ্ত তরঙ্গ ছাড়া নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানো কঠিন। তবে তরঙ্গের মূল্য কমানো বা কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার সুফল গ্রাহক পাচ্ছেন কি না, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
বিটিআরসির ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মোবাইল সেবা নিয়ে মোট ১১ হাজার ৬৬৭টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এর মধ্যে সেবার মান বা ‘কোয়ালিটি অব সার্ভিস’ নিয়ে অভিযোগ ছিল ৪ হাজার ১৬২টি।
অন্য অভিযোগগুলোর মধ্যে বিবিধ বিষয়ে ১ হাজার ৩৪৩টি, মূল্য সংযোজন সেবা বা ভ্যাস নিয়ে ৯২৮টি, ডেটার গতি নিয়ে ৭৩৬টি এবং কল ও এসএমএস-সংক্রান্ত বিষয়ে ৫৩৯টি অভিযোগ ছিল। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে মোট ১১ হাজার ৩৬২টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে; অনিষ্পন্ন ছিল ৩০৫টি।
এর আগের দুই অর্থবছরেও অভিযোগের সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১ হাজার ৪২৭টি অভিযোগের মধ্যে ১০ হাজার ৩১১টি নিষ্পত্তি হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১ হাজার ২২৫টি অভিযোগের বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছিল ৮ হাজার ৯২০টি। তিন অর্থবছরেই অভিযোগের শীর্ষে ছিল সেবার মান।
অভিযোগের এই ধারাবাহিকতা ইঙ্গিত দেয়, শুধু অভিযোগ নিষ্পত্তির সংখ্যা দিয়ে গ্রাহকসেবার প্রকৃত উন্নতি বোঝা যায় না। অভিযোগের পুনরাবৃত্তি, নেটওয়ার্কের বাস্তব সক্ষমতা এবং নির্দিষ্ট এলাকায় সেবার মানও নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
‘গ্রাহকস্বার্থ নিশ্চিত করেই ছাড় দিতে হবে’
মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, “আমাদের দেশে মোবাইল অপারেটরদের কাছে গ্রাহকরা একপ্রকার জিম্মি। অপারেটররা সরকারের কাছ থেকে নানা সুযোগ-সুবিধা নিলেও গ্রাহকদের নিম্নমানের সেবা দিচ্ছে। তরঙ্গ নবায়নে ছাড় দেওয়ার আগে গ্রাহকস্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে।”
তিনি বলেন, তরঙ্গের দাম কমানো ও কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুবিধা দিলে এর সুফল গ্রাহকদেরও দিতে হবে। নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, কলড্রপ কমানো এবং সাশ্রয়ী দামে মানসম্মত ইন্টারনেট নিশ্চিত করার শর্ত দিতে হবে। শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে ছাড় প্রত্যাহারসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সিদ্ধান্ত সরকারের, ব্যাখ্যা বিটিআরসির
বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জুয়েল বলেন, প্রথমবারের মতো গবেষণার ভিত্তিতে স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। স্পেকট্রামের দাম ও লাইসেন্সের মেয়াদসংক্রান্ত প্রস্তাব ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এমটবের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, অপারেটরদের সংগঠন চিঠি দিয়ে তাদের দাবি-দাওয়া জানাচ্ছে। তারা তাদের দাবি জানাতেই পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।
তরঙ্গ নবায়নের এই সিদ্ধান্তে একদিকে অপারেটরদের বিনিয়োগ ও আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে, অন্যদিকে সরকারি রাজস্ব এবং গ্রাহকের অধিকারও সমান গুরুত্ব পেতে হবে। মূল্যছাড় ও দীর্ঘমেয়াদি কিস্তির সুবিধা দেওয়া হলে তার বিপরীতে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, কলড্রপ কমানো, ডেটার গতি উন্নত করা এবং সেবার মান পরিমাপের কার্যকর শর্ত যুক্ত করা যায় কি না, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তরঙ্গ নবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে এসব শর্তের প্রতিফলন থাকবে কি না, তা নির্ভর করছে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।





















