রাজধানীতে মোবাইল ফোন চুরি বা ছিনতাই হওয়ার পর থানায় জিডি করেও আর হদিস মিলছে না। কারণ, ফোন হাতে পাওয়ার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এর ‘পরিচয়’ বা আইএমইআই (IMEI) নম্বর বদলে ফেলছে চোর চক্র।
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) জানিয়েছে, গুগলের অ্যান্ড্রয়েড প্ল্যাটফর্মের ফোনগুলোর ক্ষেত্রে চোরেরা এমন এক অত্যাধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করছে, যা দিয়ে মাত্র ৪-৫ সেকেন্ডেই আইএমইআই বদলে ফেলা সম্ভব হচ্ছে। ফলে পুরোনো আইএমইআই দিয়ে ট্র্যাক করে ফোন উদ্ধার করা এখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ‘খুবই দুরূহ’ বা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি প্রায় এক হাজার চোরাই মোবাইল ফোনসহ ছিনতাইকারী চক্রের ২০ সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
নেপথ্যে দেলোয়ার সিন্ডিকেট র্যাবের অভিযানে উঠে এসেছে গুলিস্তানকেন্দ্রিক এক বিশাল চোর সিন্ডিকেটের নাম। এই চক্রের মূল হোতা দেলোয়ার। গত ৫-৬ বছরে এই চক্রটি প্রায় ২০ হাজার মোবাইল ফোন চুরি ও ছিনতাই করে আইএমইআই পরিবর্তন করে বিক্রি করেছে।
জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, চক্রের সদস্যরা নিজেরা যেমন ছিনতাই করে, তেমনি অন্যদের কাছ থেকেও চোরাই ফোন কেনে। এরপর আইএমইআই বদলে ভালো মানের ফোনগুলো মোবাইল মেরামতের দোকানে ৫০০ থেকে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়। আর একটু নিম্নমানের বা খারাপ ফোনগুলো গুলিস্তানসহ বিভিন্ন ফুটপাতে টেবিল বসিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করা হয়।
আইফোন নিয়ে চোরদের অনীহা অ্যান্ড্রয়েড ফোনের আইএমইআই সহজে বদলানো গেলেও আইফোনের ক্ষেত্রে বিষয়টি জটিল। গ্রেপ্তারকৃতরা জানায়, অ্যাপলের আইফোনের আইএমইআই পরিবর্তনের খরচ অনেক বেশি এবং এর কারিগরি নিরাপত্তা ভেদ করা কঠিন। তাই ছিনতাইকারীরা আইফোন হাতে পেলে ঝুঁকি না নিয়ে দ্রুত মোবাইল যন্ত্রাংশের দোকানে বা মেরামতের দোকানে বিক্রি করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে আইফোনগুলো যন্ত্রাংশ (Parts) হিসেবে খুলে বিক্রি করা হয় অথবা দেশের বাইরে পাচার করে দেওয়া হয়।
জিডি বা মামলা কেন কাজে আসছে না? পুলিশ ও র্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, ভুক্তভোগীরা সাধারণত ফোনের বক্সে থাকা আসল আইএমইআই নম্বর দিয়ে থানায় জিডি বা মামলা করেন। কিন্তু চোরেরা সফটওয়্যার দিয়ে সেই নম্বরটি মুছে নতুন একটি ভুয়া নম্বর বসিয়ে দেয়।
র্যাবের এক কর্মকর্তা বলেন, “একবার আইএমইআই পরিবর্তন করার পর আগের নম্বরটি আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা তখন কেবল পরিবর্তিত নম্বরটিই দেখতে পাই। এমনকি চোররাও আর পুরোনো নম্বর বের করতে পারে না। ফলে ট্র্যাকিং প্রযুক্তিতে ওই ফোনের আর কোনো অস্তিত্বই থাকে না।”
বিটিআরসি কী বলছে? বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) বলছে, আইএমইআই নম্বর মূলত জিএসএমএ (GSMA) থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং প্রতিটি হ্যান্ডসেটের জন্য এটি স্বতন্ত্র থাকে। সফটওয়্যার দিয়ে হার্ডওয়্যার লেভেলের এই নম্বর বদলানোর বিষয়ে বিটিআরসি কিছুটা সংশয় প্রকাশ করলেও, চোরদের এই প্রযুক্তির কথা উড়িয়ে দিচ্ছে না।
সংস্থাটি বলছে, বর্তমানে এই ফোনগুলো শনাক্ত করা কঠিন হলেও ভবিষ্যতে এনইআইআর (NEIR) বা ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার সিস্টেম পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এই সমস্যা কমবে। তখন বিটিআরসির ডাটাবেজে নিবন্ধিত আসল আইএমইআই ছাড়া কোনো ফোন নেটওয়ার্কে সচল থাকবে না। ফলে চোরেরা ভুয়া আইএমইআই বসালেও তা নেটওয়ার্ক গ্রহণ করবে না।






















