দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যাংক ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড (EBL)-এর ডিজিটাল ব্যাংকিং ও এটিএম ট্রানজেকশন সিস্টেমের নিরাপত্তা এবং গ্রাহক সেবার কঙ্কালসার রূপ উন্মোচিত হয়েছে। অন্য ব্যাংকের এটিএম বুথ ব্যবহার করে টাকা তুলতে গিয়ে ওটিসি (Out of Network) ট্রানজেকশন ফেইল হওয়ার পরও গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে বারবার টাকা কেটে নেওয়া এবং কোনো প্রকার নোটিফিকেশন ছাড়া টাকা গায়েব করার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ব্যাংকটির বিরুদ্ধে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ও প্রযুক্তি খাতের সাথে যুক্ত সচেতন গ্রাহকদের বরাতে জানা গেছে, ব্যাংকগুলোর এই ধরনের প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে সাধারণ মানুষ তাদের কষ্টার্জিত টাকার নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কায় ভুগছেন।
ঘটনার সূত্রপাত: টাকা না এলেও ব্যালেন্স ডেবিট
অভিযোগকারী গ্রাহকের বিবরণ অনুযায়ী, গত ৩০ মে, ২০২৬ তারিখ সন্ধ্যা আনুমানিক ৭:০০ টার দিকে তিনি অন্য একটি ব্যাংকের (UCB) এটিএম বুথ থেকে ৫,০০০ টাকা উত্তোলনের চেষ্টা করেন। সে সময় ইউসিবি-র বুথ থেকে কোনো টাকা বের হয়নি এবং স্ক্রিনে ‘ট্রানজেকশন ফেইলড/ক্যান্সেলড’ প্রদর্শন করে। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে ইবিএল (EBL) অ্যাকাউন্ট থেকে গ্রাহকের ৫,০০০ টাকা কেটে নেওয়া হয়।
গ্রাহক সাথে সাথে ইবিএল কাস্টমার কেয়ারে কল দিলে সাময়িকভাবে বিষয়টি সমাধান করা হয় এবং ইবিএল-এর নিজস্ব অটো-রিভার্সাল বা ইনস্ট্যান্ট সেটেলমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে টাকাটি গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ফেরত (Reverse) পাঠানো হয়। গ্রাহক ব্যালেন্স চেক করে টাকা ফেরত পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হন।
আসল নাটক: ২ দিন পর মেসেজ ছাড়াই আবার টাকা গায়েব!
ঘটনার মূল জটিলতা শুরু হয় আজ ২ জুন সকালে। গ্রাহক হুট করে ব্যালেন্স চেক করে দেখতে পান যে, তার ফোনে কোনো প্রকার অ্যালার্ট, ওটিপি বা ডেবিট মেসেজ পাঠানো ছাড়াই অ্যাকাউন্ট থেকে আবার ৫,০০০ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে।
গ্রাহক তাৎক্ষণিকভাবে ইবিএল কাস্টমার কেয়ারে ফোন দিলে ব্যাংকটির প্রতিনিধিরা প্রথমে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। তারা দাবি করেন, গ্রাহক নাকি আজ সকালেই ইউসিবি (UCB) ব্যাংক থেকে টাকা তুলেছেন। গ্রাহক যখন চ্যালেঞ্জ করেন যে তিনি মাত্র ঘুম থেকে উঠেছেন এবং কোনো লেনদেনই করেননি, তখন কাস্টমার কেয়ার ভালোমতো চেক করে তাদের ভুল স্বীকার করে। তারা জানায়, ৩০ তারিখে যে টাকাটি ইবিএল রিভার্স (ফেরত) করেছিল, সেই টাকাটিই আজ ইউসিবি (UCB) ব্যাংক তাদের সেন্ট্রাল ক্লিয়ারিং রিকোয়েস্টের মাধ্যমে ইবিএল অ্যাকাউন্ট থেকে কেটে নিয়েছে!
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই ভুলের সুষ্ঠু সমাধান বা তাৎক্ষণিক রিফান্ড না দিয়ে ইবিএল কর্তৃপক্ষ গ্রাহককে জানিয়েছে— এই টাকা ফেরত পেতে ৩৫ থেকে ৭০ কার্যদিবস (Working Days) সময় লাগবে!
গ্রাহকের যৌক্তিক প্রশ্ন এবং ব্যাংকিং সিস্টেমের ফাঁকফোকর
এই ঘটনার পর ইবিএল ও দেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার দিকে ৩টি বড় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন ভুক্তভোগী গ্রাহক:
১. মেসেজ ছাড়া টাকা কাটা: অ্যাকাউন্ট থেকে ৫,০০০ টাকা কেটে নেওয়া হলো, অথচ গ্রাহকের ফোনে কোনো ইনস্ট্যান্ট এসএমএস অ্যালার্ট গেল না কেন? ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সিকিউরিটি প্রোটোকল কি এতটাই দুর্বল?
২. অন্য ব্যাংকের এক্সেস: একজন গ্রাহক ইবিএল-এর। তার অ্যাকাউন্টের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব ইবিএল-এর। সেখানে অন্য একটি ব্যাংক (UCB) দুই দিন পর ইবিএল-এর সিস্টেমের ভেতর ঢুকে সরাসরি টাকা কেটে নেওয়ার এক্সেস বা অনুমতি পায় কীভাবে?
৩. লাখ টাকার অ্যাকাউন্টে ঝুঁকি: গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে ব্যালেন্স কম ছিল বলে ৫,০০০ টাকা কমে যাওয়াটা চোখে পড়েছে। কিন্তু যেসব ব্যবসায়ী বা গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা লেনদেন হয়, তাদের অ্যাকাউন্ট থেকে যদি এভাবে মেসেজ ছাড়া টাকা গায়েব হয়ে যায়, তবে তারা তো টেরই পাবেন না!
কারিগরি ব্যাখ্যা: ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ (NPSB)-এর জটিলতা
ব্যাংকিং খাতের আইটি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মূলত ‘ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ’ (NPSB) বা ক্লিয়ারিং হাউজের ব্যাক-এন্ড সেটেলমেন্টের একটি বড় ত্রুটি। যখন এক ব্যাংকের কার্ড অন্য ব্যাংকের এটিএম-এ ব্যবহার করা হয়, তখন দুই ব্যাংকের সার্ভারের মধ্যে একটি ডেটা রিকোয়েস্ট আদান-প্রদান হয়।
৩০ তারিখে লেনদেন ফেইল হওয়ার পর ইবিএল তাদের সাময়িক রেকর্ডের ভিত্তিতে গ্রাহককে টাকা রিভার্স করে দেয়। কিন্তু ২ দিন পর যখন ইউসিবি (Acquirer Bank) তাদের এটিএম-এর ফাইনাল ক্লিয়ারিং লক বা খতিয়ান ইবিএল (Issuer Bank)-এর কাছে পাঠায়, তখন সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরে নেয় যে টাকাটি প্রদান করা হয়েছে (যদিও বাস্তবে টাকা বের হয়নি)। ফলে ইবিএল-এর সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে ইউসিবি-কে দিয়ে দেয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় ম্যানুয়াল ভেরিফিকেশন না থাকায় এবং তাৎক্ষণিক মেসেজ অ্যালার্ট সিস্টেম অফ থাকায় গ্রাহক সম্পূর্ণ অন্ধকারে থাকেন।
ভোক্তা অধিকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা লঙ্ঘন
বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্টের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে যে, এটিএম বা অনলাইন লেনদেনে কোনো প্রকার টেকনিক্যাল ফেইলর বা ডাবল ডেবিট হলে তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে (সাধারণত ৭ থেকে ১০ কর্মদিবস) সমাধান করতে হবে। সেখানে ৩৫ থেকে ৭০ কার্যদিবস সময় চাওয়া গ্রাহক হয়রানির চরম পর্যায় এবং এটি সম্পূর্ণ বেআইনি।


















