দীর্ঘ ঈদের ছুটি শেষে রাজধানীসহ সারা দেশে অফিস-আদালত ও ব্যবসা-বাণিজ্য খুললেও দেশের অন্যতম শীর্ষ বেসরকারি ব্যাংক ‘ডাচ-বাংলা ব্যাংক পিএলসি’ (DBBL)-এর এটিএম বুথগুলোতে নগদ টাকার তীব্র হাহাকার দেখা দিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এবং ঢাকার বাইরের বড় বড় জেলাগুলোতে ব্যাংকটির বুথগুলোতে টাকা না পেয়ে কার্ডধারী সাধারণ গ্রাহক এবং মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ‘রকেট’ (Rocket)-এর ব্যবহারকারীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
বুথগুলোতে দিনের পর দিন টাকা না থাকা এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতার কারণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ মাঠপর্যায়ে অনেক ক্ষুব্ধ গ্রাহক প্রশ্ন তুলছেন— “ডাচ-বাংলা ব্যাংক কি তবে দেউলিয়া হওয়ার পথে?”
আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) সকালে মতিঝিলের দিলকুশা রোডে ব্যাংকটির লোকাল অফিস সংলগ্ন মূল এটিএম বুথটির অর্ধেক শাটার বন্ধ অবস্থায় দেখা যায়। বুথের নিরাপত্তারক্ষী সরাসরি কাস্টমারদের ভেতরে ঢুকতে বাধা দিয়ে জানান, বুথে কোনো টাকা নেই এবং ব্যাংক অফিস থেকে টাকা রিফিল করার জন্য কেউ আসছেন না। ফলে নিরুপায় হয়ে গ্রাহকদের অন্য বুথে যেতে হচ্ছে।
এই চিত্র কেবল মতিঝিলেই সীমাবদ্ধ নয়; মুগদা ও মানিকনগরের দুটি বুথ থেকেও গতকাল বিকেল থেকে অসংখ্য গ্রাহক খালি হাতে ফিরে গেছেন। মুগদার বুথে আসা ভুক্তভোগী গ্রাহক মুন্না টেকজুম ডটটিভিকে বলেন, “আমি গুলশানের দুটি বুথে গিয়ে টাকা না পেয়ে ব্যর্থ হয়ে নিজের এলাকার বুথে এসেছিলাম। কিন্তু এখানেও টাকা নেই।” আরেক ভুক্তহোড়ী জানান, তিনি দুদিন ধরে মুগদার বুথ থেকে টাকা তোলার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে প্রতিবেশীর কাছ থেকে ধার করে সংসারের জরুরি কাজ চালাচ্ছেন।
সবচেয়ে অদ্ভুত দৃশ্য দেখা গেছে মানিকনগর পুকুরপাড়ের বুথে। সেখানেও দুদিন ধরে ক্যাশ টাকা ছিল না। কোনো গ্রাহক টাকা জমা (Deposit) দিলেই কেবল সেই পরিমাণ টাকা অন্য গ্রাহক তুলতে পারছেন। ফলে বুথের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রাহকেরা অন্য কোনো গ্রাহকের জন্য অপেক্ষা করছেন যিনি টাকা জমা দিতে আসবেন, যাতে তার অ্যাকাউন্টে অনলাইন বা রকেটের মাধ্যমে টাকা ট্রান্সফার করে দিয়ে তার কাছ থেকে নগদ টাকা নেওয়া যায়।
আজ দুপুরের পর রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত তিন বাণিজ্যিক এলাকা ফার্মগেট, পান্থপথ এবং কারওয়ান বাজারের ডাচ-বাংলা বুথগুলোতে গিয়েও গ্রাহকদের তীব্র ক্ষোভ ও চরম ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে:

ফার্মগেট থেকে অতিক: ফার্মগেটের হলিক্রস স্কুলের মোড়ের বুথে টাকা তুলতে এসে ব্যর্থ হওয়া বেসরকারি চাকুরিজীবী অতিক টেকজুম ডটটিভিকে বলেন, “অফিস খোলার পর বাড়ি যাওয়ার জরুরি খরচ মেটাতে টাকা তুলতে এসেছিলাম। কিন্তু ফার্মগেটের তিনটি বুথ ঘুরেও কোনো টাকা পাইনি। স্ক্রিনে শুধু লেখা উঠছে ‘টাকা নেই’। ডাচ-বাংলা ব্যাংক কি আসলেই কোনো বড় সংকটে পড়েছে কি না তা নিয়ে আমরা এখন সত্যি সন্দিহান।”
পান্থপথ থেকে ফারহাদ: পান্থপথ স্কয়ার হাসপাতালের সংলগ্ন বুথের সামনে ক্ষুব্ধ দাঁড়িয়ে থাকা ফারহাদ বলেন, “হাসপাতালের বিল পরিশোধের জন্য জরুরি নগদ টাকার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বুথে এসে দেখি টাকা নেই। ডাচ-বাংলার মতো একটা ব্যাংকের এই গুরুত্বপূর্ণ বুথে যদি ঈদের পর ৪ দিন ধরে ক্যাশ না থাকে, তবে মানুষ বিপদে যাবে কোথায়? ব্যাংক কি দেউলিয়া হওয়ার পথে যে বুথে দেওয়ার মতো ক্যাশ টাকাও তাদের ভল্টে নেই?”
কারওয়ান বাজার থেকে সোহেল: কাওরান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী সোহেল তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ঈদের ছুটির পর আজ বড় মালের পেমেন্ট দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ব্যাংকের লাইনেও যেমন ভিড়, বুথগুলোতেও তেমনি টাকা নেই। ডাচ-বাংলা ব্যাংক আমাদের সেবা দেওয়ার নামে বছরের পর বছর শুধু কার্ডের চার্জ কাটে, কিন্তু কাজের সময় তাদের সার্ভিস পুরোপুরি জিরো।”
ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এই এটিএম নেটওয়ার্কের বিপর্যয় কেবল রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নেই। ঢাকার বাইরে দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহর থেকেও গ্রাহকদের তীব্র ক্ষোভ ও অপারেটরের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার খবর আসছে:
চট্টগ্রাম (জিইসি মোড় ও বহদ্দারহাট): চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটের তিনটি বুথ ঘুরেও এক টাকাও তুলতে না পেরে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী নেওয়াজ আহমেদ বলেন, “ঈদের পর ব্যবসার লেনদেন শুরু হয়েছে, কিন্তু ডাচ-বাংলার বুথগুলোতে ‘টাকা নেই’ বা ‘টেকনিক্যাল ফল্ট’ দেখাচ্ছে। ব্যাংকগুলোর বর্তমান যে অবস্থা, তাতে টানা কয়েকদিন বুথ খালি দেখলে সাধারণ মানুষের মনে ভয় লাগাটাই স্বাভাবিক যে ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে কি না!”
সিলেট (জিন্দাবাজার): সিলেটের জিন্দাবাজারে রকেট অ্যাপের মাধ্যমে টাকা তুলতে আসা রেমিট্যান্স যোদ্ধা পরিবারের সদস্য সুফিয়ান আহমেদ জানান, প্রবাস থেকে পাঠানো টাকা ঈদের পর তুলতে গিয়ে তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। ব্যাংকের বুথগুলোতে টাকা না থাকায় এজেন্টের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে, যেখানে অতিরিক্ত ক্যাশ-আউট চার্জ গুণতে হচ্ছে।
খুলনা (শিববাড়ী মোড়): খুলনার শিববাড়ী মোড়ের ডাচ-বাংলা বুথের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্ষুব্ধ গ্রাহক তানিয়া সুলতানা বলেন, “ঈদের ছুটির পর ব্যাংক খোলার দুই দিন পার হয়ে গেল, অথচ বুথগুলোতে টাকা রিফিলের কোনো বালাই নেই। ডাচ-বাংলা ব্যাংক গ্রাহকদের শুধু কার্ডের বাৎসরিক ফি আর এসএমএস চার্জ কাটতেই ওস্তাদ, কিন্তু সেবার বেলায় শূন্য।”
বগুড়া (সাতমাথা): উত্তরের জেলা বগুড়ার সাতমাথার বুথগুলোতেও একই অবস্থা। গ্রাহকদের অভিযোগ, ঈদের আগের দিন থেকে যে সংকট শুরু হয়েছে, তা আজ ৯ জুন পর্যন্ত কাটেনি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে ফোন দিলে তারা শুধু ‘সার্ভার ডাউন’ বা ‘টাকা লোড হচ্ছে’ বলে আশ্বস্ত করে, কিন্তু বাস্তবে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
দেশের সাধারণ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটি বিশাল অংশ ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম এবং রকেট সেবার ওপর নির্ভরশীল। ডিজিটাল ব্যাংকিং বা ক্যাশলেস ইকোনমির বড় বড় স্লোগান মাঠে তখনই মার খাবে, যখন গ্রাহকেরা তাদের নিজেদের জমানো কষ্টের টাকা আপদ-বিপদে বা প্রয়োজনে বুথ থেকে তুলতে পারবেন না।




















