বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) এখন আর সাধারণ কোনো সেবা নয়; এটি দেশের কোটি মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। তবে এই সেবার প্রসার যত বাড়ছে, ততই জোরালো হচ্ছে একটি প্রশ্ন—ব্যক্তিগত লেনদেনে কেন এত উচ্চ হারে সার্ভিস চার্জ দিতে হবে? বিশ্বের অনেক দেশে যেখানে ব্যক্তিগত লেনদেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা যায়, সেখানে আমাদের দেশে প্রতি হাজার টাকা তুলতে গ্রাহককে গুনতে হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত।
এই উচ্চ চার্জের কারণে ডিজিটাল আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
দৈনিক চার্জ আদায়ের একটি তাত্ত্বিক হিসাব
বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদের একটি পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোবাইল ব্যাংকিং বা এমএফএস-এ দৈনিক মোট লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৭,০০০ থেকে ৮,০০০ কোটি টাকা। এই লেনদেনের ওপর ভিত্তি করে দৈনিক চার্জ আদায়ের একটি অনুমাননির্ভর বা তাত্ত্বিক (Hypothetical) হিসাব নিচে দেওয়া হলো:
দৈনিক লেনদেন ৭,০০০ কোটি টাকা হলে: প্রতি ১,০০০ টাকা লেনদেনে ন্যূনতম ১৬ টাকা চার্জ ধরলে, দিনে মোট ৭ কোটি বার লেনদেন হয়। সেই হিসাবে দৈনিক চার্জ আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ১১২ কোটি টাকা।
দৈনিক লেনদেন ৮,০০০ কোটি টাকা হলে: একই নিয়মে দিনে ৮ কোটি বার লেনদেনের বিপরীতে দৈনিক চার্জ আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১২৮ কোটি টাকা।
বাস্তবতার ভিন্নতা:
তবে এটি একটি সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক হিসাব। বাস্তবে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের সব ধরনের লেনদেনে এই একই হারে ১৬ টাকা চার্জ প্রযোজ্য হয় না। মার্চেন্ট পেমেন্ট, পার্সন-টু-পার্সন (P2P) সেন্ড মানি, সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন বিতরণ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ কিংবা ক্যাশ-ইন ইত্যাদির ক্ষেত্রে চার্জের হার ভিন্ন বা অনেক ক্ষেত্রে একদম শূন্য (০)। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আয় এর চেয়ে কম বা বেশি হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দৈনিক গড় লেনদেনের পরিমাণ ও ধরণ প্রতিনিয়ত ওঠানামা করে।
ডিজিটাল পেমেন্টে গ্লোবাল চিত্র: কোথায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ?
বিশ্বের এবং বিশেষ করে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর ডিজিটাল পেমেন্ট ও মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থার দিকে তাকালে বাংলাদেশের উচ্চ চার্জের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে:
ভারত (UPI): ভারতের ‘ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস’ বা ইউপিআই (UPI) ব্যবস্থায় সাধারণ ব্যাংক-টু-ব্যাংক ডিজিটাল লেনদেনে গ্রাহকদের জন্য কোনো লেনদেন ফি নেই। এটি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সেবা দিয়ে বিশ্বজুড়ে নজির স্থাপন করেছে।
থাইল্যান্ড (PromptPay): থাইল্যান্ডের প্রম্পটপে (PromptPay) ব্যবস্থায় ব্যক্তি-থেকে-ব্যক্তি (P2P) লেনদেন অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বা নামমাত্র খরচে করা যায়।
সিঙ্গাপুর (PayNow): সিঙ্গাপুরের পে-নাও (PayNow) সেবার মাধ্যমেও ব্যক্তিগত স্তরের লেনদেন সাধারণত একদম বিনামূল্যে করা হয়ে থাকে।
ইন্দোনেশিয়া (QRIS): দেশটির কিউআরআইএস (QRIS) ব্যবস্থায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য মার্চেন্ট চার্জও অত্যন্ত কম, যা প্রায় মাত্র ০.৩% বা তারও নিচে।
ভোক্তা অধিকার সংগঠনের দাবি ও যৌক্তিকতা
এই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন দাবি তুলেছে যে, দেশের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এই ক্যাশ-আউট বা সার্ভিস চার্জ কমিয়ে সিঙ্গেল ডিজিটে (১০ টাকার নিচে বা এক অঙ্কের পর্যায়ে) নামিয়ে আনা উচিত।
সংগঠনটির মতে, সরকারকে যদি প্রকৃত অর্থেই ক্যাশলেস অর্থনীতি সম্প্রসারণ করতে হয়, তবে সাধারণ মানুষের ওপর থেকে এই আর্থিক বোঝা কমাতে হবে। তবে খাত সংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, চার্জের উপযুক্ত মাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে অপারেটরদের পরিচালন ব্যয় (Operational Cost), এজেন্টদের কমিশন, সাইবার জালিয়াতি প্রতিরোধে নিরাপত্তা অবকাঠামো নির্মাণ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক ব্যয়ের বিষয়টিও সমানভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।




















