সরকারি বাঙলা কলেজের শেষ বর্ষের এক শিক্ষার্থীর জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), নাম ও ছবি ব্যবহার করে দ্য সিটি ব্যাংক লিমিটেডের গুলশান-১ শাখায় ব্যাংক হিসাব খোলার অভিযোগ উঠেছে। ওই হিসাবের মাধ্যমে লাখ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেন হলেও বিষয়টি সম্পর্কে কিছুই জানতেন না বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ইমরান হাফিজ।
অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় জানা যায়, ২০২৫ সালের এপ্রিলে সিটি ব্যাংকের গুলশান-১ শাখায় ইমরান হাফিজের নামে একটি হিসাব খোলা হয়। সেখানে তাকে ব্যবসায়ী হিসেবে দেখানো হলেও ব্যবহার করা হয় ভুয়া তথ্য ও একটি ট্রেড লাইসেন্স। হিসাব চালুর পর পরই এতে সন্দেহজনকভাবে বিপুল অর্থ লেনদেন হয়।
তথ্য অনুযায়ী, হিসাব খোলার পরবর্তী এক মাসেই প্রায় ২৪ লাখ টাকার লেনদেন হয়। আরটিজিএস ও এনপিএসবির মাধ্যমে এসব অর্থ স্থানান্তর ও উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সাইবার প্রতারণার তদন্তে বেরিয়ে আসে তথ্য
চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাইবার ট্রাইব্যুনালে করা ৪২ লাখ ৭৩ হাজার টাকার অনলাইন প্রতারণার একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে।
মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট সিটি ব্যাংকের কাছে সংশ্লিষ্ট হিসাবের তথ্য চায়। এরপর হিসাবটির মালিক হিসেবে ইমরান হাফিজের নাম থাকার বিষয়টি সামনে আসে।
পরবর্তীতে সিএমপির পাশাপাশি উত্তরা পূর্ব থানা ও সাতক্ষীরার কালিগঞ্জ থানা পুলিশও বিষয়টি তদন্ত করে। সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্য যাচাইয়ের পর ইমরান ওই হিসাব খোলার সঙ্গে জড়িত নন বলে তদন্তে উঠে আসে।
এআই দিয়ে ছবি পরিবর্তনের অভিযোগ
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, তার অজান্তে ছবি সংগ্রহ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিবর্তন করা হয়। এরপর সেই ছবি ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়।
হিসাব খোলার নথিতে থাকা স্বাক্ষর ও ঠিকানাও তার নয় বলে দাবি করেছেন ইমরান। এমনকি ব্যাংক হিসাবে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটিও তার নিজের নয়।
অনুসন্ধানে ওই নম্বরের মালিক হিসেবে মাদারীপুরের এক স্কুল শিক্ষকের তথ্য পাওয়া যায়। নমিনি হিসেবে যে নারীর তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে, তিনি গাইবান্ধার নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত একজন বাসিন্দা। তাদের কারও সঙ্গে ইমরানের পরিচয় নেই বলে জানা গেছে।
অস্তিত্ব নেই ‘ফাহাদ টেলিকমের’
ব্যাংক হিসাবে ইমরানকে ব্যবসায়ী হিসেবে দেখাতে ‘ফাহাদ টেলিকম’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্য ব্যবহার করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির নামে উত্তরার একটি ঠিকানা এবং ই-ট্রেড লাইসেন্সও দেখানো হয়েছিল।
তবে তদন্তে ওই ঠিকানায় ‘ফাহাদ টেলিকম’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় ব্যাংক হিসাব খোলার সময় গ্রাহকের উপস্থিতি ও পরিচয় যাচাইয়ের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট নথিতে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সশরীরে উপস্থিতি যাচাইয়ের তথ্য থাকলেও প্রকৃত ইমরান সেখানে উপস্থিত না থাকলে হিসাবটি কীভাবে অনুমোদন পেল—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
কেওয়াইসি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন
ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে গ্রাহকের পরিচয়, ছবি, স্বাক্ষর, ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করা কেওয়াইসি বা ‘নো ইয়োর কাস্টমার’ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া তথ্যের মাধ্যমে হিসাব খোলা এবং পরে সেখানে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠায় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ যাচাই ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে এআই ব্যবহার করে ছবি পরিবর্তন, ভুয়া স্বাক্ষর ও অপরিচিত ব্যক্তির মোবাইল নম্বর ব্যবহারের মতো বিষয়গুলো সঠিকভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
নিরাপত্তায় আইনি পদক্ষেপ
নিজেকে ভবিষ্যতের কোনো আইনি জটিলতা থেকে সুরক্ষিত রাখতে ইমরান ইতোমধ্যে গুলশান মডেল থানা, মিরপুরের শাহ আলী থানা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
আইন বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তি সংশ্লিষ্টদের মতে, কারও পরিচয় ব্যবহার করে ব্যাংক হিসাব খোলা এবং সেই হিসাবে প্রতারণার অর্থ লেনদেনের অভিযোগ গুরুতর ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।
তাদের মতে, শুধু প্রতারক চক্রকে শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; হিসাব খোলার সময় ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট তৃতীয় পক্ষের কেউ নিয়ম ভেঙেছেন বা যোগসাজশ করেছেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হলে ভুয়া পরিচয়ে হিসাব খোলার পুরো প্রক্রিয়া এবং এর পেছনে কারা ছিলেন, তা স্পষ্ট হতে পারে।




















