মার্কেটিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দায়িত্বশীল ব্যবহার, মানবিক মূল্যবোধ ও প্রযুক্তির সমন্বয় নিয়ে দুই দিনব্যাপী আলোচনার মধ্য দিয়ে রাজধানীর ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং ফোরাম ৬.০’। আন্তর্জাতিক এ আয়োজনের ষষ্ঠ আসরে দেশি-বিদেশি শীর্ষ মার্কেটিং পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ, সরকারি প্রতিনিধি ও খাতসংশ্লিষ্টরা অংশ নেন।
ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির সৌজন্যে এবং এসিআই মটরস লিমিটেডের সঞ্চালনায় আয়োজিত এ ফোরামের আহ্বায়ক ছিল ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিল (ডব্লিউএমসি)। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি ও ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের অংশীদারত্বে এবং বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের কো-হোস্টিংয়ে অনুষ্ঠিত হয় এবারের আয়োজন। ফোরামের প্রতিপাদ্য ছিল ‘আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইন মার্কেটিং: হিউম্যান + টেক’।
আয়োজকদের মতে, মানুষের সৃজনশীলতা, বিচারবুদ্ধি, নৈতিকতা ও ভোক্তার আস্থা অক্ষুণ্ন রেখে কীভাবে মার্কেটিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকর ও দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়েই দুই দিনের আলোচনা সাজানো হয়।
মানুষের নেতৃত্বে প্রযুক্তির ব্যবহার
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিল ও মার্কেটিং সোসাইটি অব বাংলাদেশের (এমএসবি) সেক্রেটারি জেনারেল এবং বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরামের গ্রুপ চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ও এক্সিকিউটিভ এডিটর সাজিদ মাহবুব।
তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্ব থেকে আসা মার্কেটার, শিক্ষাবিদ ও ইন্ডাস্ট্রি লিডারদের ঢাকায় স্বাগত জানাতে পেরে আমরা সম্মানিত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রাহককে সেবা দেওয়ার ধরন বদলে দিচ্ছে, তবে মার্কেটিংয়ের উদ্দেশ্য ঠিক করে মানুষই। ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং ফোরাম এমন একটি মঞ্চ, যেখানে আমরা একে অপরের কাছ থেকে শিখতে পারি এবং এমন ভবিষ্যৎ গড়তে পারি, যেখানে প্রযুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধ একসঙ্গে এগিয়ে যাবে।’
উদ্বোধনী বক্তব্যে ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ মুজিবুল হক আন্তর্জাতিক অতিথিদের স্বাগত জানান। একই সঙ্গে এআইনির্ভর ভবিষ্যতের জন্য মার্কেটিং পেশাজীবীদের প্রস্তুত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ফিলিপ কটলারের পরামর্শ: এআই হবে মানুষের সহায়ক
ফোরামের প্রথম দিনের কিনোট পর্বের সূচনা করেন আধুনিক মার্কেটিংয়ের জনক হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক ফিলিপ কটলার। ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবসায়িক দক্ষতা বাড়ানো, গ্রাহকের চাহিদা বোঝা, বাজারের নতুন সুযোগ শনাক্ত করা এবং বিক্রি ও মুনাফার পূর্বাভাস দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে এআইয়ের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে ধাপে ধাপে ও দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তিটি গ্রহণের পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের সক্ষমতাকে সহায়তা করবে, প্রতিস্থাপন করবে না। তাই মার্কেটিংয়ে মানুষের সৃজনশীলতা, তদারকি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা অপরিহার্য।
মার্কেটিং ও ফাইন্যান্স বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দেন কটলার। তাঁর মতে, গ্রাহক বৃদ্ধি, ব্র্যান্ড গঠন, বাজেট ও আর্থিক পারফরম্যান্সের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে দুই বিভাগকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি এআইয়ে বিনিয়োগ উৎপাদনশীলতা, ব্যয় ও মুনাফায় কতটা সুফল আনছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
প্রযুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের সমন্বয়
ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং ফোরামের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও এশিয়া মার্কেটিং ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা হারমাওয়ান কারতাজায়া তাঁর বক্তব্যে বলেন, সফল মার্কেটিংয়ের জন্য প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা, আস্থা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বয় জরুরি।
তাঁর মতে, বাজারে নিজেদের আলাদা করে তুলে ধরতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্রাহকের পরিবর্তিত চাহিদা, সামাজিক প্রত্যাশা ও সাংস্কৃতিক প্রবণতা বুঝতে হবে। এআই নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ ও উন্নত গ্রাহক অভিজ্ঞতা তৈরি করবে। তবে এর ব্যবহার পরিচালিত হতে হবে মানুষের দায়িত্ববোধ দিয়ে।
প্রচলিত প্রতিযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে নতুন পণ্য, অভিজ্ঞতা ও বাজার তৈরির মাধ্যমে ‘জেনারেটিভ অ্যাডভান্টেজ’ অর্জনের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে মুনাফার পাশাপাশি নৈতিক ব্যবসা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে সমাজ ও পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন।
বৈশ্বিক মার্কেটিংয়ে এআইয়ের নতুন সম্ভাবনা
ফোরামের প্রথম দিনে আরও বক্তব্য দেন গুগলের হেড অব পার্টনার পারফরম্যান্স, চ্যানেল সেলস—দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তারা ইউন এবং আইট্রেইন এশিয়ার প্রতিষ্ঠাতা এরিক কু।
তারা ইউন মানুষের কৌতূহল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতাকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে কার্যকর মার্কেটিংয়ের সম্ভাবনা তুলে ধরেন। অন্যদিকে এরিক কু দেখান, কীভাবে এআই সাধারণ ভোক্তাদের কনটেন্ট নির্মাতায় পরিণত করছে। এতে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে মার্কেটিং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ সহজ হচ্ছে এবং আয়ের নতুন পথ তৈরি হচ্ছে।
দ্বিতীয় দিনের কিনোট পর্বে বক্তব্য দেন ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক সৈয়দ ফরহাত আনোয়ার। এআইকে মার্কেটিংয়ের অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে তুলে ধরে ব্র্যান্ড ও ভোক্তার ওপর এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
এ ছাড়া মার্কেটিং অ্যাসোসিয়েশন অব থাইল্যান্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও চিফ অব লার্নিং আর্কিটেক্ট অ্যান্ড মার্কেটিং ইনোভেশন ড. ড্যান ভিসিতচাইচান মানুষের চিন্তাশক্তি ও বুদ্ধিমান যন্ত্রের অংশীদারত্বকে মার্কেটিংয়ের ভবিষ্যৎ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
আফ্রিকান মার্কেটিং কনফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট হেলেন ম্যাকইনটি-কার্লাইল বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের স্থানীয় বাজারে প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার কৌশল নিয়ে আলোচনা করেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ. কে. এনামুল হক বিশ্লেষণ করেন, এআইয়ের মাধ্যমে বাড়তে থাকা উৎপাদনশীলতার সুফল শেষ পর্যন্ত কারা পাচ্ছে। ভসু.এআইয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতা নাফিস ফয়সাল উদ্যোক্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এআইয়ের ভবিষ্যৎ তুলে ধরেন। ইউরোপিয়ান মার্কেটিং কনফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট রালফ স্ট্রাউস মার্কেটিংয়ে এআইয়ের নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা করেন।
ক্ষুদ্র উদ্যোগের প্রতিযোগিতা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-শিল্প সহযোগিতা
দুই দিনের আয়োজনজুড়ে অনুষ্ঠিত হয় ১০টি কিনোট সেশন, দুটি কেইস স্টাডি ও দুটি প্যানেল আলোচনা। প্যানেল আলোচনায় উঠে আসে মার্কেটিংয়ে এআই ব্যবহারের বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা।
প্রথম দিনের আলোচনায় প্রশ্ন ওঠে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের জন্য প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সমান করতে পারে কি না। সাশ্রয়ী প্রযুক্তি কীভাবে ছোট ব্যবসাকে বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিতে পারে এবং তা কার্যকরভাবে ব্যবহারে কী প্রয়োজন, সে বিষয়ে মত দেন আলোচকেরা।
দ্বিতীয় দিনের প্যানেলে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। একাডেমিক গবেষণা কীভাবে বাস্তব ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহারযোগ্য হতে পারে, তা ছিল আলোচনার মূল বিষয়। এ ছাড়া ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি এবং কোরিয়ার কে-কালচারে কৃত্রিম ও অ্যানালগ বুদ্ধিমত্তার সমন্বয় নিয়ে দুটি কেইস স্টাডি উপস্থাপন করা হয়।
৫৪ দেশের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানের ‘ঢাকা ঘোষণা’
ফোরামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন ছিল ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিলের ‘দ্য ঢাকা ডিক্লারেশন’ বা ‘ঢাকা ঘোষণা’। এর প্রতিপাদ্য ‘মার্কেটিং ফর গ্লোবাল গুড: ২০৩০ অ্যান্ড বিয়ন্ড’।
ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিলের উদ্যোগে এশিয়া মার্কেটিং ফেডারেশন, আফ্রিকান মার্কেটিং কনফেডারেশন ও ইউরোপিয়ান মার্কেটিং কনফেডারেশনের যৌথ অংশগ্রহণে ঘোষণাটি উপস্থাপন করা হয়। এতে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের ৫৪টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক কল্যাণে বিপণনচর্চার প্রসার, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং ২০৩০ সাল ও পরবর্তী সময়ের জন্য অভিন্ন লক্ষ্য ও অঙ্গীকার তুলে ধরে।
আয়োজকদের মতে, এআইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা থেকে শুরু করে বৈশ্বিক কল্যাণে মার্কেটিংয়ের ভূমিকা—সব ক্ষেত্রেই ফোরামের মূল বার্তা ছিল একটিই: মানুষের বিচারবুদ্ধি, নৈতিকতা ও আস্থাকে ভিত্তি করেই প্রযুক্তি দীর্ঘমেয়াদি মূল্য তৈরি করতে পারে।
ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির সৌজন্যে, এসিআই মটরস লিমিটেডের সঞ্চালনায় এবং প্রাণের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয় ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং ফোরাম ৬.০। আয়োজনে ছিল বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম। সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল এশিয়া মার্কেটিং ফেডারেশন, ইউরোপিয়ান মার্কেটিং কনফেডারেশন, আফ্রিকান মার্কেটিং কনফেডারেশন, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক বিজনেস স্কুল, মার্কেটিং সোসাইটি অব বাংলাদেশ, মার্কেটার্স ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ, ব্যাকপেজ পিআর এবং ওয়ার্ল্ড মার্কেটিং কাউন্সিল।





















