দেশের অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি (ওটিএ) খাত বড় ধরনের ধাক্কার মুখে পড়েছে। ফ্লাইট এক্সপার্ট নামের প্রতিষ্ঠান শতকোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়ার অভিযোগে বাজারে নেমেছে চরম অনিশ্চয়তা। এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে খাতের দুই প্রধান প্রতিযোগী গো জায়ান ও শেয়ারট্রিপ।
ফ্লাইট এক্সপার্ট কয়েক বছর ধরে টিকিট, হোটেল বুকিং ও ভ্রমণসেবা দিয়ে আসছিল। গ্রাহক, সাব-এজেন্ট ও বিভিন্ন এয়ারলাইন থেকে কোটি কোটি টাকা অগ্রিম সংগ্রহ করে হঠাৎ করেই কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। একাধিক এয়ারলাইনের কাছেও তাদের বকেয়া বিল রয়েছে।
জয়িতা আফ্রিন নামে এক ট্রাভেলার বলেন, “ফ্লাইট এক্সপার্টের মতো প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি যদি পালিয়ে যায়, তাহলে কাকে বিশ্বাস করব? এখন প্রতিটি ট্রাভেল এজেন্সির প্রতিই সন্দেহ হচ্ছে।”
নিয়মিত ভ্রমণকারী মাসুদ রানা জানান, “ফ্লাইট এক্সপার্ট থেকে আমি একাধিকবার টিকিট কেটেছি। এখন আর কোনো অনলাইন এজেন্সিকেই বিশ্বাস করতে পারছি না।”
ধানমন্ডির এক সাব-এজেন্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ফ্লাইট এক্সপার্টের কাছে প্রায় ১২ লাখ টাকা আটকে গেছে। পাওয়ার আশা নেই। গোযায়ান বা শেয়ারট্রিপও একই মডেলে কাজ করে—তারা হঠাৎ করে উধাও হবে না, কে নিশ্চয়তা দিতে পারে?”
ইউনিয়ন ট্রাভেলস লিমিটেডের পরিচালক মোহাম্মদ বিন মোস্তফা বলেন, আমার ২৫ লাখ টাকার টিকিট ছিল। এখন পর্যন্ত নিশ্চিত ক্ষতি হয়েছে ১৫ লাখ টাকা। এই টিকিটগুলো নতুন করে কিনে যাত্রীদের দিতে হয়েছে। বাকি ১০ লাখ টাকার টিকিটে যাত্রীর নামের রেকর্ড (পিএনআর) এখনো দেখাচ্ছে। এগুলো বাতিল হলে ক্ষতি আরও বাড়বে। টাকা উদ্ধারের প্রক্রিয়াটি আদালতের ওপর নির্ভর করছে। নিজের গাড়ি বিক্রি করে, এফডিআর ভেঙে এবং বাচ্চাদের ভবিষ্যতের জন্য জমা করা সঞ্চয়ের অর্থ ভেঙে টিকিটের ব্যবস্থা করতে হয়েছে। ক্রেতার আস্থা ধরে রাখতে যা করা দরকার করেছি। আমার জানামতে আরও কয়েক এজেন্টের ৪০ ও ৭০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। কেউ কেউ দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন। ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে কোনো আশ্বাস পাইনি।
ঘটনার পর গ্রাহকেরা একসঙ্গে গোযায়ান ও শেয়ারট্রিপের কাছে রিফান্ড এবং সাপোর্ট আবেদন জমা দিচ্ছেন। ফলে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক চাপ হঠাৎ বেড়ে গেছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আস্থা হারানোর প্রভাব বাজারে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বয়ে আনতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, “ওটিএ খাত বাংলাদেশের পর্যটনকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখানে আর্থিক স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ নেই। দ্রুত কার্যকর নীতিমালা না এলে গোযায়ান বা শেয়ারট্রিপের মতো ভালো কোম্পানিগুলোও গ্রাহকের আস্থা হারাতে পারে।”
ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, ট্রাভেল সেক্টরে বর্তমানে কোনো সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রক কাঠামো না থাকায় কোম্পানিগুলো অডিট বা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়াই বিপুল পরিমাণ টাকা লেনদেন করছে। এতে প্রতারণার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে।
সব মিলিয়ে, ফ্লাইট এক্সপার্ট কেলেঙ্কারি কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং পুরো ওটিএ খাতের জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনলাইন টিকিট বুকিং প্ল্যাটফর্ম ফ্লাইট এক্সপার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দিশাহারা হয়ে পড়েছেন দেশের ট্রাভেল এজেন্টরা। ছোট ও মাঝারি টিকিট বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউ কেউ দেউলিয়া হয়ে পড়েছেন। কেউ সম্পত্তি বিক্রি করে যাত্রীদের জন্য নতুন প্লেন টিকিট কিনছেন। কেউ গা ঢাকা দিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২০০-এর বেশি এজেন্ট। সংশ্লিষ্টরা জানান, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুরো খাতে। যাত্রীসহ এজেন্টদের মধ্যে আস্থাহীনতা কাজ করছে।






















