পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেড একযোগে পর্ষদের তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং ভয়াবহ আর্থিক সংকটে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল আজিজ ও তার ছেলে ভাইস চেয়ারম্যান একেএম আবদুল আলিমের মধ্যে ক্ষমতার বিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এই অচলাবস্থার মধ্যেই ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (২৯.৩ শতাংশ) ছুঁয়েছে, যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা। শরিয়াভিত্তিক এই ব্যাংকটির খেলাপি ঋণের এমন ঊর্ধ্বগতি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায় তীব্র সমস্যা থাকার বিষয়টিকে স্পষ্ট করে তুলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও (বাংলাদেশ ব্যাংক) ব্যাংকটিকে নিবিড় নজরদারিতে রেখেছে বলে নথিপত্রে তথ্য পাওয়া গেছে।
এমডিকে নিয়ে পর্ষদ বিভক্ত দেশের ব্যাংকিং খাত যখন আস্থা সংকট আর খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে, ঠিক সেই সময় স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের ১৬ সদস্যের বোর্ড দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিরোধের মূলে রয়েছেন বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. হাবিবুর রহমান।
ভাইস চেয়ারম্যান আলিমের নেতৃত্বাধীন পক্ষ এমডি হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে। তারা তার সাবেক কর্মস্থল ইউনিয়ন ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ এনে তাকে অপসারণের দাবি জানিয়েছে। এই পক্ষটি এমডিকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠাতে দুবার বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠিও দিয়েছে।
তবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের অনুরোধ নাকচ করে জানিয়েছে, এমডির বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনো প্রমাণিত হয়নি। তাই হাবিবুর রহমানকেই এমডি পদে রাখতে হবে।
বিপরীতে, চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল আজিজের নেতৃত্বাধীন পক্ষ এমডিকে ‘নির্দ্দোষ’ দাবি করছে। চেয়ারম্যান আজিজ গত ৫ নভেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে লেখা এক চিঠিতে জানান, অন্য পক্ষ ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করছে এবং লন্ডন ও যুক্তরাষ্ট্রের এক্সচেঞ্জ হাউজসহ মূল জায়গাগুলোতে তাদের পছন্দের লোক নিয়োগ দিতে চায়। তিনি বলেন, “এমডি কোনো ভুল করেননি। যদি করতেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাকে থাকতে দিত না।”
এর চার দিন পর আলিমপক্ষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আরেকটি চিঠি পাঠিয়ে এমডির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) “অনেকগুলো মামলা” থাকার কথা উল্লেখ করে তাকে সরানোর দাবি জানায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, এই বিরোধে সিদ্ধান্ত নেওয়াই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বোর্ডের বৈঠকগুলো প্রায়ই কর্মকর্তাদের নিয়োগ-বদলি আর ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে তর্কে শেষ হয়।
ব্যালান্স শিটে ধস পর্ষদের এই বিবাদ এমন এক সময়ে চলছে, যখন ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালের শেষে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ৫ হাজার ৯৬৮ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৯.৩ শতাংশ। মাত্র চার বছর আগে এই হার ছিল মাত্র ৪.৮ শতাংশ।
সূত্রমতে, গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক পরিদর্শনে এসে ব্যাংকটির অনেক ‘লুকানো’ খেলাপি ঋণ উদ্ঘাটন করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে আগে ‘ভালো’ হিসেবে দেখানো অনেক ঋণকে ‘খেলাপি’ হিসেবে পুনঃশ্রেণিকরণ করার ফলেই খেলাপি ঋণের পরিমাণ এতটা বেড়েছে। ২০২৩ সালে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ১ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকা।
ব্যাংকের এমডি ও সিইও হাবিবুর রহমান স্বীকার করেছেন যে, ২০২৪ সালের শেষে খেলাপি ঋণ প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ছিল। তবে তিনি দাবি করেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তারা ৯০০ কোটি টাকা কমাতে পেরেছেন।
অন্যান্য অভিযোগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান আলিম পক্ষের পরিচালক কামাল মোস্তফা চৌধুরী অভিযোগ করেন, এমডির বিরুদ্ধে দুদকে দুর্নীতির মামলা রয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এমডি প্রায় ১০০ কর্মচারীকে ছাঁটাই করেছেন এবং বোর্ড মিটিংয়ে পুলিশ নিয়ে আসেন।
তবে এমডি হাবিবুর রহমান সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি ইউনিয়ন ব্যাংকে কোনো অনিয়মে জড়িত ছিলেন না। তিনি দাবি করেন, আলিমপক্ষ “অনৈতিক কর্মকাণ্ডে” সহযোগিতা না করায় তাকে সরাতে চায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরেফিন হোসেন খান জানান, এমডির বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে, তবে এখনো কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তিনি বলেন, “পরিচালকদের অন্তর্কলহ ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ করতে পারে।”
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ মঈনুল ইসলাম বলেন, “অনেক বেসরকারি ব্যাংকের বোর্ডেই এমন বিরোধ দেখা যায়, যা প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত খারাপ অবস্থায় নিয়ে যায়। পরিচালকরা ব্যাংকের নয়, নিজেদের স্বার্থ আগে দেখেন। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত দ্রুত হস্তক্ষেপ করা।”






















