নারায়ণগঞ্জের একজন ব্যবসায়ী গত সপ্তাহে অনলাইনে একটি মোবাইল ফোন অর্ডার করেছিলেন। অর্ডার করার দীর্ঘ ১০ দিন পর যখন পার্সেলটি তার হাতে পৌঁছায়, তখন বাক্স খুলে তিনি হতবাক হয়ে যান; মোবাইলের বদলে ভেতরে রাখা ছিল কেবল পাথর। এরপর কাস্টমার কেয়ার কিংবা সংশ্লিষ্ট ফেইসবুক পেইজে বারবার যোগাযোগ করেও কোনো সাড়া পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত প্রতারকদের ফাঁদে পড়ে নিজের কষ্টার্জিত টাকা হারিয়ে চুপ হয়ে যাওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না।
এই একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা কেবল একজন ক্রেতার ক্ষতি নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক ই-কমার্স খাতের সবচেয়ে বড় কঙ্কালসার রূপ এবং মূল সংকটটিকে স্পষ্ট করে তোলে। দেশের ডিজিটাল বাজার দ্রুত বড় হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ গ্রাহকদের আস্থার জায়গাটি এখনো অত্যন্ত নড়বড়ে।
ছবির অন্য পিঠ: গ্রামীণ অর্থনীতিতে নীরব বিপ্লব
আস্থার সংকট এবং প্রতারণার অন্ধকার ছায়ার পাশাপাশি দেশের ই-কমার্সের একটি অত্যন্ত আশাবাদী ও উজ্জ্বল দিকও রয়েছে, যা মূলত গ্রামীণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের হাত ধরে এগিয়ে চলছে।
ব্যাংকিং খাতের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায়, ২০২৫ সালে রাজশাহীতে একটি ব্যাংকিং কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া বাঘা উপজেলার এক আমচাষি আগে যেখানে স্থানীয় আড়তদারের মাধ্যমে আম বিক্রি করতেন, তিনি এখন ফেইসবুক ও কুরিয়ার সেবার মাধ্যমে সরাসরি ঢাকার ক্রেতাদের কাছে আম পাঠাচ্ছেন। এতে তার নিজস্ব আয় যেমন বেড়েছে, তেমনি ক্রেতারাও কম দামে ভালো পণ্য পাচ্ছেন।
একই বছর (২০২৫ সালে) কুমিল্লার লাকসামে এক নারী উদ্যোক্তা ঘরে তৈরি খাবার বিক্রি করে ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। বর্তমানে অনলাইনে নিয়মিত অর্ডার নিয়ে তিনি শুধু নিজের আয়ের পথই তৈরি করেননি, বরং আরও কয়েকজন নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।
পরিসংখ্যানে ই-কমার্সের বিশাল প্রবৃদ্ধি
সমস্যা ও সম্ভাবনার এই দোলাচলের মধ্যেও দেশের ই-কমার্স খাতের প্রবৃদ্ধির গ্রাফ বেশ শক্তিশালী।
বাজারের আকার: বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩১তম বৃহত্তম ই-commerce বাজার। ২০২১ সালে এই বাজারের আকার ছিল প্রায় ৫৬ হাজার কোটি টাকা। ‘রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেটস’-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের মধ্যে এই বাজারের আকার দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
লেনদেন ও উদ্যোগ: ই-ক্যাবের (e-CAB) হিসাবমতে, দেশে বর্তমানে সক্রিয় ই-কমার্স উদ্যোগের সংখ্যা দুই লাখ ছাড়িয়েছে। প্রতিদিন প্রায় আট লাখ অর্ডার হচ্ছে, যার দৈনিক লেনদেন একশো কোটি টাকার কাছাকাছি।
ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া: বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ছিল ১৩ কোটি ৮৬ লাখ। অন্যদিকে দেশে ফেইসবুক ব্যবহারকারী প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ। বর্তমানে সাড়ে তিন লাখের বেশি ফেইসবুক পেইজ দেশে সক্রিয়ভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে।
ফেইসবুকনির্ভরতা ও ‘ই-ভ্যালি-ই-অরেঞ্জ’ ট্রমা
বাজারের এই বিশাল সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে আছে এক বড় কাঠামোগত দুর্বলতা। দেশের সিংহভাগ অনলাইন উদ্যোগই এখন পুরোপুরি ফেইসবুকনির্ভর (F-Commerce)। এদের বড় অংশের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিবন্ধন নেই, কোনো জবাবদিহির ব্যবস্থা নেই এবং সুনির্দিষ্ট কোনো রিটার্ন পলিসি নেই। ফলে গ্রাহক প্রতারিত হলে কোথাও অভিযোগ করতে না পেরে পরবর্তী সময়ে অনলাইনে কেনাকাটা করতেই আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।
অতীতের কেলেঙ্কারিগুলো এই অবিশ্বাসের ক্ষতকে আরও গভীর করেছে। লোভনীয় ছাড়ের ফাঁদ পেতে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া ‘ই-ভ্যালি’র ধাক্কায় পুরো খাতের বিশ্বাসযোগ্যতায় চিড় ধরেছিল। এর সাথে ২০২১ সালের মাঝামাঝি সময়ে ‘ই-অরেঞ্জ’ নামক আরেকটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১ হাজার cien কোটি টাকা আত্মসাৎ ও গ্রাহক প্রতারণার বড় কেলেঙ্কারি উন্মোচিত হয়। পরবর্তীতে আলেশা মার্ট, কিউকম, ধামাকাসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একই পথে হেঁটে এই খাতের সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে, যাদের সিংহভাগই এখন বন্ধ।
আইন বনাম দুর্বল বাস্তবায়ন
এখানে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে— এই খাতের সংকট কি শুধু আইনের অভাব, নাকি বাস্তবায়নের দুর্বলতা? পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংকট মূলত বাস্তবায়নের ঘাটতিতেই। দেশে ‘ডিজিটাল কমার্স পলিসি ২০১৮’ প্রণীত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২১ সালে গ্রাহকের টাকা সুরক্ষায় ‘এসক্রো সার্ভিস’ (Escrow Service) চালু করেছে এবং নির্দেশিকায় পণ্য সরবরাহের সময়সীমাও নির্ধারণ করা আছে। কিন্তু যে অধিদপ্তরের কাজ এটি তদারকি করা, তাদের লোকবল ও প্রযুক্তি দুটোই অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে নিয়মগুলো কাগজে-কলমে থাকলেও মাঠে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।
লজিস্টিকস সংকট এবং পোস্ট অফিসের অব্যবহৃত নেটওয়ার্ক
লজিস্টিকস সাপোর্টের ক্ষেত্রে ঢাকা ও বড় শহরগুলোতে পেপারফ্লাই বা রেডএক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত ডেলিভারি দিলেও, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ গ্রামীণ মানুষের কাছে এই সেবা এখনো অনিয়মিত। অথচ দেশে প্রায় ১০ হাজার পোস্ট অফিস এবং ৪০ হাজার কর্মী রয়েছে। এই বিশাল নেটওয়ার্ককে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজ করে কাজে লাগাতে পারলে গ্রামীণ ডেলিভারির সমস্যার অনেকটাই টেকসই সমাধান সম্ভব হতো, যা এখনো পুরোপুরি ব্যবহার করা যায়নি।
বিনিয়োগ খরা ও রাজস্বের বিপুল ক্ষতি
লাইটক্যাসল পার্টনারসের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন বলছে, সে বছরের প্রথমার্ধে দেশের ই-কমার্স ও স্টার্টআপ খাতে মাত্র ১ কোটি ৯০ লাখ ডলার বিনিয়োগ এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৭ শতাংশ কম। কর-সংক্রান্ত জটিলতা, নীতিমালার অনিশ্চয়তা এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
পাশাপাশি, বাংলাদেশ থেকে প্রতিদিন প্রায় দুই লাখ ডলারের ফেইসবুক বিজ্ঞাপন খরচ হচ্ছে। গুগল, ফেইসবুক, অ্যামাজনের মতো বৈশ্বিক জায়ান্টরা এই বাজার থেকে বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) আদায় এর ধারেকাছেও নেই। এই বিপুল পরিমাণ রাজস্বের একটা অংশও যদি দেশে রাখা যেত, তবে তা দেশীয় ই-কমার্স অবকাঠামো তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারত।
আন্তর্জাতিক বাজার ও পাঁচ ট্রিলিয়নের বৈশ্বিক সুযোগ
আঙ্কটাডের (UNCTAD) ২০২৩ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক ই-কমার্স রপ্তানি বাজার বর্তমানে পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের জামদানী, নকশিকাঁথা, চামড়াজাত পণ্য কিংবা আইটি সার্ভিসের বড় জায়গা রয়েছে। ই-ক্যাবের তথ্যমতে, দেশের দুই হাজারের বেশি উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে আমাজন, এটসি বা ইবে-র মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কাজ করছেন। কিন্তু বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট গেটওয়ের অভাব, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের জটিলতা এবং পণ্য সার্টিফিকেশনের কঠিন নিয়মের কারণে আমরা ভিয়েতনামের মতো রপ্তানি হাব তৈরি করতে পারছি না।
ভবিষ্যতের পথ: তরুণ প্রজন্ম ও ৫টি জরুরি পদক্ষেপ
পুরো চিত্রটি কিন্তু সম্পূর্ণ নেতিবাচক নয়। বাংলাদেশের ই-কমার্স ব্যবহারকারীর প্রায় ৭৫ শতাংশই ১৮ থেকে ৩৪ বছর বয়সী, অর্থাৎ এই বাজারের মূল চালিকাশক্তি দেশের তরুণ প্রজন্ম। গ্রামাঞ্চল থেকে কৃষিভিত্তিক উদ্যোগ ও নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যা এই খাতের আসল প্রাণ।
ডিজিটাল অর্থনীতিতে ই-কমার্সকে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে অনতিবিলম্বে ৫টি কাজ করা প্রয়োজন:
১. ইন্টারনেটকে ‘পাবলিক ইউটিলিটি’ ঘোষণা করা, যেন সংযোগ কখনো বাধাগ্রস্ত না হয়।
২. ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ডিজিটাল নিবন্ধন ও জামানতমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করা।
৩. ক্রস-বর্ডার (আন্তর্জাতিক) বাণিজ্যের জন্য আলাদা ডেডিকেটেড ফ্যাসিলিটেশন সেল গঠন।
৪. ডিজিটাল কমার্স আইন সংশোধন করে তা মাঠে কঠোরভাবে প্রয়োগ করা।
৫. দেশের বিশাল পোস্ট অফিস নেটওয়ার্ককে ই-কমার্স ডেলিভারির কাজে পুরোপুরি নিয়োজিত করা।


















