নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চড়া মূল্যস্ফীতির বাজারে সাধারণ মানুষের জন্য আরও একটি বড় দুঃসংবাদ নিয়ে এলো প্রযুক্তি বিশ্ব। চলতি ২০২৬ বছর এবং আগামী ২০২৭ সালে বিশ্ববাজারে ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে থাকা সাশ্রয়ী দামের স্মার্টফোনের সরবরাহ মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ওমডিয়া’ (Omdia)-এর সাম্প্রতিক এক পূর্বাভাসে এই আশঙ্কাজনক তথ্য জানানো হয়েছে। খবর সিনেট (CNET)।
মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) অবকাঠামো নির্মাণ এবং মেমোরি চিপের (RAM) উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার কারণেই বিশ্বজুড়ে এই বাজেট ফোনের সংকট তৈরি হয়েছে।
ওমডিয়ার ত্রৈমাসিক ‘স্মার্টফোন প্রযুক্তি ট্রেন্ডস’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববাজারে ৪০০ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৫০ হাজার টাকা)-এর নিচের লো বা মিড-রেঞ্জের ফোনের সরবরাহ আগামী বছর অন্তত ২২ শতাংশ কমে যেতে পারে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়বেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪০০ ডলার বা তার চেয়ে কম দামের সাশ্রয়ী ফোনগুলোতে যে মেমোরি চিপ ব্যবহার করা হয়, তার উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ বা ডাবল হয়ে গেছে।
ওমডিয়ার জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক জাকের লি জানান, মেমোরির এই বাড়তি খরচ সামাল দিতে কিছু স্মার্টফোন প্রস্তুতকারী কোম্পানি ডিভাইসের স্ক্রিন, ক্যামেরা সেন্সর ও রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি মডিউলের মতো অন্যান্য যন্ত্রাংশের খরচ কমানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু মেমোরির দাম যেভাবে আকাশচুম্বী হচ্ছে, তাতে অন্যান্য যন্ত্রাংশের কোয়ালিটি কমিয়েও ফোনের দাম আর সস্তা রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
মেমোরি সংকটের কারণে শাওমি, অপো, ভিভো এবং অনরের মতো জনপ্রিয় চীনা ফোন নির্মাতারা ইতিমধ্যেই তাদের অনেক ডিভাইসের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের ধারণা, অতিরিক্ত দাম বাড়ার কারণে সাধারণ ক্রেতারা এসব ফোন কেনা কমিয়ে দেবেন। আর চাহিদা এভাবে কমে গেলে কোম্পানিগুলো একপর্যায়ে কম দামি ফোন তৈরি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো বড় বড় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অবকাঠামো তৈরির কারণে বর্তমানে মেমোরির তীব্র বৈশ্বিক সংকট দেখা দিয়েছে। এই এআই সিস্টেম ও ডেটা সেন্টারগুলো সচল রাখতে বিশ্বব্যাপী বিপুল পরিমাণ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন র্যামের (RAM) প্রয়োজন হচ্ছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সাধারণ মোবাইল ফোনের বাজারে।
ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশনের (IDC) গ্লোবাল ক্লায়েন্ট ডিভাইসের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিসকো জেরোনিমো জানান, কিছু বড় ফোন বিক্রেতা ব্র্যান্ড বাজেট ফোনের বাজার পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার কথা গুরুত্বের সাথে ভাবছেন। কারণ কম দামি ফোনে মেমোরির খরচই যদি দ্বিগুণ হয়ে যায়, তবে প্রফিট মার্জিন না থাকায় এই সেগমেন্টে ব্যবসা করে লাভ করা আর সম্ভব নয়।
বাজেট বা সাশ্রয়ী ফোনের বাজারে ধস নামলেও দামি বা প্রিমিয়াম ফ্ল্যাগশিপ ফোনে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। ক্রেতাদের একাংশ চড়া দামেও আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স কিংবা স্যামসাং গ্যালাক্সি এস২৬ আল্ট্রার মতো ১ হাজার ডলারের বেশি মূল্যের প্রিমিয়াম ফোনগুলো আগের মতোই স্বাভাবিক হারে কিনছেন।
ওমডিয়ার মতে, চলতি বছরেই ৪০০ ডলারের বেশি দামি ফোনের বাজার প্রায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ সম্প্রসারণ হবে।
সামগ্রিকভাবে মেমোরি চিপের এই তীব্র সংকটের কারণে ওমডিয়া ধারণা করছে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর বিশ্বব্যাপী স্মার্টফোনের সামগ্রিক বাজার প্রায় ১২ শতাংশ সংকুচিত হবে। তবে ক্রেতাদের জন্য আশার কথা হলো, ২০২৭ সালের শেষ দিকে কিংবা ২০২৮ সালের শুরুতে বৈশ্বিক র্যাম সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান হতে পারে।


















