বিলাসী ঘড়ি বলতে এতদিন স্বর্ণ, প্লাটিনাম কিংবা স্টিলের মতো ধাতুর কথাই বেশি মনে করা হতো। ঘড়ির দাম ও মর্যাদা বোঝাতে এসব উপাদানের ব্যবহার ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে সে ধারণায় পরিবর্তন আসছে। দামি ঘড়ি নির্মাতারা এখন স্বর্ণ ও স্টিলের পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নানা নতুন ও বিরল উপাদান ব্যবহার করছেন। এসব দেখতে অনেক সময় প্লাস্টিকের মতো হলেও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বেশ উন্নত।
সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি বিলাসী ঘড়ি বাজারে এসেছে, যেগুলোয় প্রচলিত ধাতুর বদলে কার্বন, সিরামিক, কোয়ার্টজ ফাইবারসহ বিভিন্ন উন্নত উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন এইচ মোজার অ্যান্ড সি’স-এর নতুন ‘স্ট্রিমলাইনার পাম্প’ মডেলের কেস তৈরি করা হয়েছে ফোর্জড কোয়ার্টজ ফাইবার দিয়ে। বিরল এ উপাদান ঘড়ি তৈরিতে খুব বেশি দেখা যায় না।
অন্যদিকে বিয়ানশের ‘আল্ট্রাফিনো মাসেরাতি’ তৈরি হয়েছে ফোর্জড কার্বন দিয়ে। টিউডরের নতুন ব্ল্যাক বে মডেলে সিরামিক ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি ঘড়িটির ব্রেসলেটেও এ উপাদান রয়েছে। রিচার্ড মিল, আইডব্লিউসি শ্যাফহাউজেন, অডেমার পিগে ও পানারাইয়ের মতো ব্র্যান্ডও সিলিকন কার্বাইড ও বাল্ক মেটালিক গ্লাসের মতো উপাদান নিয়ে কাজ করছে।
কিছু ব্র্যান্ড আরো নতুন ধরনের উপাদান ব্যবহার করছে। পানারাইয়ের নতুন লুমিনর মারিনা মডেলে ব্যবহার করা হয়েছে ‘কার্বোটেক’। ইউলিস নাদাঁ ব্যবহার করছে ‘কার্বোনিয়াম’। আর অডেমার পিগে ‘ক্রোমা ফোর্জড কম্পোজিট’ নামে একটি উপাদানের পেটেন্ট করেছে।
এসব উপাদান ব্যবহারের পেছনে শুধু নকশার বিষয়টি কাজ করছে না। অনেক ক্ষেত্রে এগুলোর ব্যবহারিক সুবিধাও রয়েছে। নতুন ধরনের উপাদান দিয়ে তৈরি ঘড়ি তুলনামূলক হালকা হতে পারে। কিছু উপাদান ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী ও অ্যালার্জির ঝুঁকি কমাতে পারে। এগুলো আঘাত ও ক্ষয় প্রতিরোধেও বেশি সক্ষম হতে পারে। একই সঙ্গে ঘড়ির কেসে প্রচলিত ধাতুর তুলনায় ভিন্ন ধরনের নকশা তৈরি করা সহজ হয়।
নতুন ব্র্যান্ড স্প্লিটের সহপ্রতিষ্ঠাতা এডওয়ার্ড মারগুলিসের মতে, বিলাসিতার সংজ্ঞায় বড় পরিবর্তন আসছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, একটি ঘড়ি বিলাসী হতে হলে সেটি অবশ্যই মূল্যবান ধাতু দিয়ে তৈরি হবে বা হীরার বেজেল থাকবে, এমন ধারণা এখন আর আগের মতো কার্যকর নয়।
তিনি বলেন, ‘অনেক ঘড়ি নির্মাতা এখনো স্টিল ব্যবহার করেন। কারণ স্টিল পালিশ করে চকচকে করা যায়। আর মানুষ সাধারণত চকচকে জিনিসকে বেশি দামি মনে করে। তবে নতুন কিছু ব্র্যান্ড সে ধারণা বদলানোর চেষ্টা করছে।’
তবে তিনি জানান, স্বর্ণ, প্লাটিনাম বা অন্যান্য প্রচলিত ধাতুর চাহিদা যে শেষ হয়ে যাচ্ছে, তা নয়।
বেল অ্যান্ড রসের প্রধান নির্বাহী কার্লোস রোসিলোর মতে, ‘নোবেল’ বা মূল্যবান উপাদানে তৈরি ঘড়ির চাহিদা ভবিষ্যতেও থাকবে। কারণ ঐতিহ্যবাহী উপাদানকে অনেকেই ক্ল্যাসিক ও দীর্ঘস্থায়ী নকশার সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন।
ঘড়ির বাজারে নতুন ধরনের ক্রেতাও তৈরি হচ্ছে। এসব গ্রাহক শুধু ঐতিহ্য বা মূল্যবান ধাতু চান না। তারা এমন উপাদান চান, যার ব্যবহারিক সুবিধা রয়েছে ও যা ঘড়িটিকে আধুনিক রূপ দেয়।
এদিকে ডিজিটাল প্রযুক্তির যুগে যান্ত্রিক বা প্রচলিত ঘড়িকে প্রাসঙ্গিক রাখা নির্মাতাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। আর বৈজ্ঞানিক উপাদান ব্যবহার সে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় একটি পথ হতে পারে। ফলে বিলাসী ঘড়ির বাজারে এখন ঐতিহ্যবাহী ধাতুর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নতুন উপাদানের ব্যবহারও বাড়ছে।


















