গ্রামের নাম নিশিপাড়া। নামের মতোই এর নৈসর্গিক সৌন্দর্য। বান্দরবানের রুমা উপজেলার ৩ নম্বর রেমাক্রি প্রাংসা ইউনিয়নে অবস্থিত এই গ্রামটি জেলা সদর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে। এখানকার মানুষ প্রতিনিয়ত প্রতিকূল প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকেন। আধুনিক নাগরিক জীবনের সামান্যতম ছোঁয়াও পৌঁছায়নি সেখানে; বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক কিংবা নূন্যতম চিকিৎসার মতো মৌলিক সুযোগ-সুবিধাগুলো আজও তাদের কাছে দুষ্পাপ্য।
তবে এই কঠিন জীবনযুদ্ধের মাঝেই সম্প্রতি গ্রামটিতে বইছে আনন্দের জোয়ার। শত বাধা ডিঙিয়ে একপ্রকার অসাধ্য সাধনই করেছেন ওই গ্রামেরই এক অদম্য তরুণী। প্রতিকূলতাকে হার মানিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ম্রো জনগোষ্ঠীর এই অকুতোভয় শিক্ষার্থীর নাম য়াপাও মুরুং।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অপার সৌন্দর্যের মাঝে বসবাসকারী অন্যতম প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময় আদিবাসী জনগোষ্ঠী ম্রো। তারা ‘মুরুং’ নামেও পরিচিত। মূলত বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ের সঙ্গে মিতালি করেই তাদের জীবন কাটে। জনসংখ্যার দিক থেকে এই জেলায় ম্রোরা দ্বিতীয় বৃহত্তম জাতিসত্তা। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০৫ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো ম্রো শিক্ষার্থী হিসেবে এই চত্বরে পা রাখলেন য়াপাও।
য়াপাওর বাবা একজন সাধারণ কৃষক। নিশিপাড়ার অন্য অনেকের মতো জুম চাষই তার জীবিকার প্রধান অবলম্বন। জীবনের নানা প্রতিকূলতা আর সীমাবদ্ধতার মাঝেও তিনি কখনো শিক্ষার প্রতি বিশ্বাস হারাননি। তিনি জানতেন, শিক্ষাই পারে তাদের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে। নিশিপাড়ায় কোনো স্কুল না থাকায় তিনি এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেন—মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে য়াপাওকে পাঠিয়ে দেন দূরের এক হোস্টেলে।
গ্রামে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন য়াপাও। এরপর তৃতীয় শ্রেণিতে তাকে ভর্তি করা হয় থানচি শহরের একটি স্কুলে। পাহাড়ে দূরত্ব মাপতে হয় সময় দিয়ে। নিশিপাড়া থেকে থানচির সেই স্কুল ছিল ৫-৬ ঘণ্টার হাঁটা পথ। পরিবার-পরিজন থেকে দূরে, এক অপরিচিত পরিবেশে তাকে কাটাতে হয়েছে অনেকগুলো বছর। হোস্টেলে থেকেই য়াপাও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়েছিলেন।
পড়াশোনার প্রতি এই প্রবল আগ্রহের মূলে ছিলেন তার বাবা। য়াপাও বলেন, “ছোটবেলা থেকে বাবা যেহেতু পড়াতেন, তখন থেকেই আমি পড়তাম। প্রতি বছর ক্লাসে পাস করার পর পড়ার ইচ্ছা আরও বেড়ে যেত। অন্যদের পড়াশোনা করতে দেখে মনে হতো, আমাকেও অনেক দূর পর্যন্ত পড়তে হবে।”
মাধ্যমিক শেষ করে তিনি ভর্তি হন বান্দরবান সরকারি কলেজে। সেখানেই প্রথম জানতে পারেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে। পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন আর নিজের অদম্য প্রচেষ্টায় অবশেষে এই ম্রো কন্যার স্বপ্ন জয় হয়েছে। য়াপাও বলেন, “বান্দরবানে হোস্টেলে থাকার সময় বড়দের কাছে শুনতাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য কেমন প্রস্তুতি নিতে হয়, কত নম্বর পেতে হয়। স্বপ্নটা তখন থেকেই বুনতে শুরু করি।”
ম্রো পাড়াগুলোতে সমস্যার যেন শেষ নেই। প্রকৃতির বৈরিতার সঙ্গে লড়াই করে যেখানে জীবন ধারণ করাই এক যুদ্ধ, সেখানে উচ্চশিক্ষা অনেকের কাছেই বিলাসিতা। য়াপাওর ভাষায়, “সেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থা একদম নেই, নেই কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সমস্যা এত বেশি যে, কোনটা রেখে কোনটা বলব!”
তবে সব না-পাওয়ার বেদনা ছাপিয়ে তার এই সাফল্য পুরো গ্রামে খুশির জোয়ার এনেছে। আর্থিক অনটন থাকলেও বাবা সব সময় সাহস ও অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন। পাশাপাশি ‘মানুষ মানুষের জন্য’ নামক একটি ফাউন্ডেশনের অবদানের কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন য়াপাও। তিনি বলেন, “এই ফাউন্ডেশন আমাকে কোচিং করার জন্য বৃত্তি দিয়েছে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম কেনা, পরীক্ষা দেওয়ার খরচ এবং ভর্তির টাকা দিয়েও তারা সাহায্য করেছে। তাদের অবদান অনেক বড়।”
য়াপাও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে তিনি বেগম রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও ক্লাসগুলো তার খুব ভালো লাগছে। উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে তিনি নিজের অঞ্চলের মানুষের জন্য কাজ করতে চান।
ম্রো পাড়াগুলোতে শিক্ষা লাভের পথ আজও কণ্টকাকীর্ণ। একদিকে দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, অন্যদিকে চরম দারিদ্র্য। য়াপাওর মতে, “গ্রামে স্কুল নেই, আর সবার পক্ষে হোস্টেলে রেখে পড়ানোর সামর্থ্যও থাকে না। আবার হোস্টেল ছাড়া পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার বিকল্পও নেই। ফলে অনেকে মাঝপথেই ঝরে পড়ে।” তবে তিনি স্বপ্ন দেখেন, একদিন তার গ্রামে স্কুল হবে, আরও অনেক শিশু শিক্ষার আলোয় আলোকিত হবে।
নিজের স্বপ্নের কথা জানিয়ে য়াপাও বলেন, “হ্যাঁ, আমি অবশ্যই চাইব গ্রামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক। যেন কাউকে দূরে গিয়ে পড়তে না হয়, সবাই যেন শিক্ষার সমান সুযোগ পায়।”
পাহাড়সম উঁচু বাধা ডিঙিয়ে য়াপাওর মতো আরও অনেক তরুণ-তরুণী সাফল্যের শিখরে পৌঁছাক—এর চেয়ে সুন্দর আর কী হতে পারে!



















