ঢাকা: অনিয়ম, দুর্নীতি, অবৈধ ক্যাম্পাস পরিচালনা এবং মালিকানা নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে বেসরকারি উচ্চশিক্ষালয় ‘ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ’ (ইইউবি)। অতীতে বিভিন্ন কেলেঙ্কারির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া ইবাইস বা দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের পথেই প্রতিষ্ঠানটি হাঁটছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং কর্মচারীদের সাথে কথা বলে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অন্ধকার চিত্র এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিক্ষা কার্যক্রমে নানা অনিয়মের কারণে বিগত দিনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এই প্রতিষ্ঠানের ওপর একটি ‘লাল তারকা’ বা রেড অ্যালার্ট জারি করেছিল। লাল তারকা থাকার কারণে নিয়মানুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রথম সমাবর্তন (কনভোকেশন) অনুষ্ঠান স্থগিত করার নির্দেশ দেয় ইউজিসি। তবে অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তা মকবুল খান শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অবৈধ পন্থায় প্রথম সমাবর্তনটি সম্পন্ন করেন।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির অনিয়মের খতিয়ান আরও দীর্ঘ হয়েছে। ইইউবি-র নামের পাশে এখন লাল তারকার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩টি, যা যেকোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চূড়ান্ত সতর্কতা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়টির দ্বিতীয় বা পরবর্তী কোনো সমাবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা এখন শূন্যের কোঠায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের জন্য ন্যূনতম ১ একর নিজস্ব জমি থাকা বাধ্যতামূলক। তবে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটির বর্তমান জমির পরিমাণ মাত্র ০.৬৭ একর, অর্থাৎ আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণ করতে এখনও ০.৩৩ একর জমির প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমান গাবতলী সংলগ্ন স্থায়ী ক্যাম্পাসের আশেপাশে নতুন কোনো জমি ফাঁকা নেই। তদুপরি, তীব্র আর্থিক সংকটের কারণে এই মুহূর্তে জমি ক্রয় করার মতো আর্থিক সক্ষমতাও বিশ্ববিদ্যালয়টির নেই বললেই চলে। ফলে স্থায়ী ক্যাম্পাস নিয়ে আইনি জটিলতা থেকে মুক্তির কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রশাসনের বিরুদ্ধে পরিবারতন্ত্র ও সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। মকবুল খান ও তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসের প্রায় ১০ হাজার স্কয়ার ফিটের একটি বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট অবৈধভাবে নিজেদের নামে লিখে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রধান জায়গা ‘অ্যাকাউন্টস সেকশন’ বা অর্থ বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ সব পদে নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের বসানো হয়েছে।
আর্থিক দুর্নীতির মূল সিন্ডিকেটটি পরিচালনা করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার মোশারফ হোসেন এবং মকবুল খানের ভাইয়ের ছেলে নাফিস খান। বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের একটি বড় অংশ নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রাক্তন কর্মচারীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়টিকে এখন কেবল ‘টাকা বানানোর মেশিন’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
জমি ও আর্থিক কেলেঙ্কারির পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব এখন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিক মামলা চলমান থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে। এছাড়া, ইউজিসির নির্ধারিত আসনের চেয়ে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে সনদ বাণিজ্যের সুপ্ত অভিযোগও খতিয়ে দেখছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান যখন নিয়মনীতির বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ও পারিবারিক স্বার্থে পরিচালিত হয়, তখন তার পতন অনিবার্য। ইউজিসি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি দ্রুত এই ৩ লাল তারকা পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তবে হাজার হাজার শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যৎ অন্ধকারের মুখে পড়বে।





















