একটি রাষ্ট্র যখন নিজের চোখের সামনে হাজার হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাতে দেখে, জনগণকে প্রতারিত হতে দেখে, বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হতে দেখে, এমনকি জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে দেখেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেরি করে—তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, রাষ্ট্র আসলে কার স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে? জনগণের, নাকি একটি শক্তিশালী অবৈধ অর্থনৈতিক সিন্ডিকেটের?
বাংলাদেশে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) ঘিরে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন এখন শুধু একটি প্রযুক্তিগত বা প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক শক্তি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জনস্বার্থ রক্ষার সক্ষমতার এক বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাস্তবতা হলো, দেশে অবৈধ মোবাইল ফোনের একটি বিশাল বাজার গড়ে উঠেছে। এই বাজার শুধু সরকারের রাজস্ব ক্ষতির কারণ নয়; বরং বৈধ ব্যবসাকে ধ্বংস করছে, হুন্ডি ও অর্থপাচারকে উৎসাহ দিচ্ছে, ভোক্তাদের প্রতারণার শিকার করছে এবং জাতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও দুর্বল করে তুলছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে—এই চক্র কেবল মোবাইল ফোন আমদানিতে সীমাবদ্ধ নয়। অভিযোগ রয়েছে, একই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় সোনা, মাদক, অবৈধ ইলেকট্রনিক পণ্যসহ নানা নিষিদ্ধ বা কর ফাঁকি দেওয়া পণ্য দেশে প্রবেশ করছে। অর্থাৎ এটি শুধু ‘গ্রে মার্কেট’ নয়; বরং রাষ্ট্রের অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে দুর্বল করে দেওয়া এক সমান্তরাল অপরাধ অর্থনীতি।
আর এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
একজন ক্রেতা হয়তো কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে একটি মোবাইল ফোন কিনছেন। তাকে বলা হচ্ছে সেটি নতুন। অথচ বাস্তবে সেটি বিদেশ থেকে আনা ব্যবহৃত ডিভাইস, যার ভেতরের যন্ত্রাংশ পরিবর্তন করা হয়েছে। কয়েকদিন না যেতেই ফোনে নেটওয়ার্ক সমস্যা, ব্যাটারি ত্রুটি, হ্যাং হওয়া কিংবা ডিসপ্লে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অথচ সাধারণ ক্রেতা বুঝতেই পারছেন না, তিনি আসলে একটি অবৈধ চোরাকারবারি চক্রের শিকার হয়েছেন।
অর্থাৎ এখানে শুধু রাষ্ট্র নয়, প্রতারিত হচ্ছে কোটি কোটি ভোক্তাও।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জনসচেতনতা বাড়ানোর পরিবর্তে অনেক সময় বিভ্রান্তিও ছড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন মহলে অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী অবৈধ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কারণে এনইআইআরকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেন এটি জনস্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত। অথচ বাস্তবে এনইআইআরের মূল উদ্দেশ্যই হলো জনগণের নিরাপত্তা, বৈধ অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষা করা।
একটি সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা হওয়া উচিত সত্য তুলে ধরা এবং অর্থনৈতিক অপরাধের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা। কিন্তু যখন অর্থনৈতিক স্বার্থ ও প্রভাবের কারণে সত্য আড়াল করা হয়, তখন সেখানে নৈতিক সংকট তৈরি হয়।
সবচেয়ে বড় বেদনার জায়গা এখানেই।
কারণ একটি রাষ্ট্রের নৈতিক অধঃপতন তখনই দৃশ্যমান হয়, যখন চোরাচালানকে ‘ব্যবসা’, কর ফাঁকিকে ‘কৌশল’ এবং হুন্ডিকে ‘বিকল্প ব্যবস্থা’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়।
বিশ্ব অনেক আগেই বুঝেছে—মোবাইল ফোন শুধু যোগাযোগের যন্ত্র নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোরও একটি অংশ। তাই ভারত, পাকিস্তান, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাসহ বহু দেশ আইএমইআইভিত্তিক নিবন্ধন ও ব্লকিং ব্যবস্থা চালু করেছে।
বাংলাদেশও ২০২১ সালে জনগণের করের প্রায় ২৯ কোটি টাকা ব্যয় করে এনইআইআর সফটওয়্যার কিনেছিল। উদ্দেশ্য ছিল বৈধ ও অবৈধ মোবাইল ফোন শনাক্ত করা এবং অননুমোদিত ডিভাইসকে নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করা।
কিন্তু বিস্ময়করভাবে চালুর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই পুরো প্রক্রিয়া কার্যত থেমে যায়।
প্রশ্ন হচ্ছে—কেন?
এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা। বিভিন্ন মহলে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে, শক্তিশালী চোরাকারবারি সিন্ডিকেট, রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর চাপের কারণেই এনইআইআর কখনও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন হয়নি।
সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আবারও এনইআইআর কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হলে মোবাইল ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর একটি অংশ তীব্র বিরোধিতা শুরু করে। এমনকি বিটিআরসি কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে। এতে বহু মানুষ গ্রেফতার হয়।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে—একটি রাষ্ট্রে জনস্বার্থ রক্ষার উদ্যোগ নিলে যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই হামলার শিকার হয়, তাহলে আইন ও প্রশাসনের কার্যকারিতা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে?
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এনইআইআর কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিয়েও নানা আলোচনা সামনে এসেছে। যদি জনস্বার্থে কাজ করতে গিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কেউ নিজেকে নিরাপদ মনে না করেন, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
এটি শুধু টেলিযোগাযোগ খাতের সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতারও প্রশ্ন।
এদিকে শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট স্মার্টফোন বাজারের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই গ্রে-মার্কেটের নিয়ন্ত্রণে। বছরে প্রায় ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের এই বাজারে অবৈধ অংশের পরিমাণ কয়েকশ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
অর্থাৎ সরকার প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রাও হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র কি এসব জানে না?
অবশ্যই জানে।
তাহলে ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন?
এখানেই জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। কারণ সাধারণ মানুষ দেখতে পাচ্ছে, সব তথ্য-প্রমাণ থাকার পরও অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ হচ্ছে না। বরং বছর বছর এটি আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জনগণের করের টাকা ব্যয় করে কেনা এনইআইআর সিস্টেম কি সত্যিই জাতীয় নিরাপত্তা ও জনস্বার্থ রক্ষার জন্য ছিল, নাকি এটি কেবল কাগজে-কলমে একটি প্রকল্প হয়েই থাকবে?
কারণ একটি রাষ্ট্র যদি কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করে, কিন্তু সেটিকে কার্যকর না করে বছরের পর বছর অচল অবস্থায় ফেলে রাখে—তাহলে জনগণ প্রশ্ন তুলবেই।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এনইআইআর এখন আর শুধু মোবাইল ফোন নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তিগত বিতর্ক নয়; এটি রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকার নিজেই বলছে, অর্থনীতি চাপে আছে, রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট রয়েছে। তাহলে চোখের সামনে হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধ পথে চলে গেলে সেটি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে না কেন?
সবশেষে একটি কথাই বলতে হয়—রাষ্ট্র পরিচালনায় সবচেয়ে বড় শক্তি হলো জনগণের আস্থা। আর সেই আস্থা ধরে রাখতে হলে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
কোনো সিন্ডিকেট, কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা অবৈধ অর্থনৈতিক চক্র যদি রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু অর্থনীতি নয়; দুর্বল হয়ে পড়বে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা।
এখন সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার—রাষ্ট্র কি জনস্বার্থের পক্ষে দাঁড়াবে, নাকি অবৈধ অর্থনীতির কাছে নতি স্বীকার করবে?
লেখক: সাংবাদিক কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা
ahabibhme@gmail.com




















