বাংলাদেশের মোবাইল ফোন শিল্প আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। গত এক দশকে দেশে মোবাইল ফোন অ্যাসেম্বলি ও উৎপাদন শিল্পের উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটেছে। এর মাধ্যমে হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, নতুন বিনিয়োগ এসেছে এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের যাত্রা আরও শক্তিশালী হয়েছে। এই অর্জন অবশ্যই ধরে রাখতে হবে।
তবে স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে যেন দেশের অফিসিয়াল স্মার্টফোন বাজার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
চলতি বছরের শুরুতে সরকার মোবাইল ফোন আমদানির ওপর মোট করের বোঝা ৬১.৮% থেকে কমিয়ে ৪৩.৪৩%-এ নিয়ে আসে। এর ফলে অফিসিয়ালভাবে আমদানিকৃত স্মার্টফোনের দাম কিছুটা প্রতিযোগিতামূলক হয় এবং বৈধ আমদানিকে উৎসাহিত করার সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু এত অল্প সময়ে এই উৎসাহ পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি, মাত্র শুরু হয়েছিল এখনই আবার শেষ হবার পথে।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আবারও আমদানিকৃত স্মার্টফোনের ওপর মোট করের বোঝা প্রায় ৬৪.২৫%-এ উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এখানেই মূল উদ্বেগ
যখন অফিসিয়ালভাবে আমদানিকৃত একটি স্মার্টফোনের দাম অতিরিক্ত বেড়ে যায়, তখন একই পণ্যের আনঅফিসিয়াল বা গ্রে মার্কেট সংস্করণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম দামে পাওয়া যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অনেক ক্রেতা অফিসিয়াল বাজার থেকে সরে গিয়ে আনঅফিসিয়াল চ্যানেলের দিকে ঝুঁকেন।
এর ক্ষতি শুধু সরকার নয়, পুরো শিল্পকে বহন করতে হয়।
অফিসিয়াল ডিস্ট্রিবিউটর ও রিটেইলাররা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন, ভোক্তারা অফিসিয়াল ওয়ারেন্টি ও বিক্রয়োত্তর সেবা থেকে বঞ্চিত হন, আর সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারায়।
অন্যদিকে, স্থানীয় উৎপাদন শিল্পকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য ২০৩০ সাল পর্যন্ত ভ্যাট সুবিধা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন কাঁচামালের ওপর কর কমানোর সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ইতিবাচক। এই ধরনের প্রণোদনা দেশীয় শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয়।
তবে বাস্তবতা হলো, সব ধরনের স্মার্টফোন বাংলাদেশে উৎপাদন করা বাণিজ্যিকভাবে সম্ভব নয়।

বিশেষ করে Apple, Google Pixel, Huawei, Motorola, Samsung ও Xiaomi-এর অনেক মিড-রেঞ্জ, প্রিমিয়াম ও বিশেষায়িত মডেল এখনও আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এসব ডিভাইসের স্থানীয় উৎপাদন খরচ অনেক ক্ষেত্রেই সরাসরি আমদানির চেয়ে বেশি পড়ে। ফলে এই সেগমেন্টের জন্য একটি কার্যকর অফিসিয়াল আমদানি ব্যবস্থা অপরিহার্য।
অবৈধ মোবাইল নিয়ন্ত্রণে NEIR এবং BTRC-এর কার্যক্রম অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যদি অফিসিয়াল ও আনঅফিসিয়াল ফোনের দামের ব্যবধান খুব বেশি থাকে, তাহলে গ্রে মার্কেট সবসময়ই টিকে থাকার সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশের স্মার্টফোন নীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বৃহত্তর অফিসিয়াল বাজার তৈরি করা।
কারণ একটি বড় অফিসিয়াল বাজার মানেই—
* সরকারের জন্য টেকসই রাজস্ব
* স্থানীয় শিল্পে আরও বিনিয়োগ
* অধিক কর্মসংস্থান
* শক্তিশালী বিক্রয়োত্তর সেবা
* উন্নত ভোক্তা সুরক্ষা
* এবং একটি সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক প্রযুক্তি বাজার।
বাংলাদেশের মোবাইল শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধুমাত্র শুল্ক বাড়ানোর ওপর নয়, বরং শিল্প সুরক্ষা, রাজস্ব আদায় এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য তৈরির ওপর।
সবচেয়ে সফল নীতি সেটিই, যা সর্বোচ্চ কর আদায়ের চেষ্টা করে না; বরং সর্বাধিক সংখ্যক গ্রাহককে বৈধ বা অফিসিয়াল বাজারে নিয়ে আসে।
লেখক: সাকিব আরাফাত
প্রতিষ্ঠাতা প্রযুক্তি পণ্য ও লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড ‘সেলেক্সা






















