ব্রেইন চিপের মাধ্যমে একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তির কম্পিউটারের কার্সর নাড়াতে পেরেছিলেন বা রোবোটিক হাত নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে, সে ঘটনা এখন দশক পুরোনো। এ প্রযুক্তির উদ্ভাবক এখন দাবি করছেন, এ প্রযুক্তি খুব শিগগিরই মানুষের কথা বা কম্পিউটার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে।
এ মাসে প্রকৌশলবিদ্যায় মর্যাদাপূর্ণ ‘কুইন এলিজাবেথ পুরস্কার’ জিতেছেন ‘ব্রেইনগেট’ নামের প্রথম ব্রেইন চিপ তৈরি করা অধ্যাপক জন ডনোহিউ।
ব্রিটিশ পত্রিকা ইন্ডিপেনডেন্ট লিখেছে, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরীক্ষার মাধ্যমে ব্রেইনগেট দলটি এমন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যা স্নায়বিক আঘাত বা রোগের কারণে হারিয়ে যাওয়া শারীরিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে।
বর্তমানে এমন ডজনখানেক কোম্পানি কাজ করছে, যার মধ্যে ইলন মাস্কের ব্রেইন ইন্টারফেইস চিপ কোম্পানি নিওরালিংক অন্যতম। প্রযুক্তিটি অধ্যাপক ডনোহিউ-এর প্রাথমিক গবেষণার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি, যেখানে মস্তিষ্কের ভেতরে থাকা বিভিন্ন ইলেকট্রোড একটি কম্পিউটার চিপের সঙ্গে যোগ থাকে এবং মস্তিষ্ক থেকে আসা বিভিন্ন স্নায়বিক সংকেত শনাক্ত করতে পারে।
এরইমধ্যে ১২ জন রোগী ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশ নিয়ে নিওরালিংক ডিভাইসের সাহায্যে কেবল চিন্তার মাধ্যমেই কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ করছেন। প্রযুক্তি বিলিয়নেয়ার মাস্কের দাবি, ভবিষ্যতে এ প্রযুক্তির মাধ্যমে সরাসরি মস্তিষ্কে মিউজিক স্ট্রিম করা, দৃষ্টিহীনদের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেওয়া এবং ‘টেলিপ্যাথি’ বা কোনো কথা না বলেই অতিমানবীয় স্তরে যোগাযোগ করা যাবে।
অন্যদিকে, স্যান ফ্রান্সিসকোর গবেষকরা এমন এক রোবোটিক হাত তৈরি করেছেন, যা মস্তিষ্ক থেকে কম্পিউটারের মাধ্যমে সংকেত গ্রহণ করে। এ প্রযুক্তির সাহায্যে নড়াচড়া বা কথা বলতে অক্ষম ব্যক্তি কোনো বস্তুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছেন।
তবে প্রথমবার যখন ব্রেইন চিপ তৈরি হয়েছিল তখনও বিজ্ঞানীরা জানতেন না পক্ষাঘাতগ্রস্ত বা প্যারালাইজড একজন ব্যক্তির নড়াচড়া সংক্রান্ত মস্তিষ্কের কোনো কার্যকলাপ বা সিগন্যাল অবশিষ্ট থাকে কি না।
অধ্যাপক ডনোহিউ বলেছেন, “সেই সময়ে আমরা জানতাম না, একজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কে নড়াচড়া সংক্রান্ত কোনো সক্রিয়তা আদৌ থাকবে কি না।
“এমন অনেক লোক ছিলেন যারা ভেবেছিলেন, মস্তিষ্কের ওই পুরো অংশটি হয়ত অকেজো হয়ে যায়। আমরা প্রমাণ করেছি, সেখানে কেবল সক্রিয়তা বা অ্যাক্টিভিটিই যে আছে, তা নয়, বরং তা প্রচুর পরিমাণে রয়েছে। তখন প্রশ্ন দাঁড়াল, আমরা এ সক্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে কী করতে পারি?”
তবে প্রথমবারের মতো গবেষক দলটি যখন ডিভাইসটি চালু করেন তখন তারা দেখেছেন, মস্তিষ্ক অসংখ্য সক্রিয় বা অসংখ্য সিগন্যাল আদান-প্রদানে ব্যস্ত, যা তাদের পূর্ব ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে।
এ ব্রেইন চিপটি একজন স্বেচ্ছাসেবীর মস্তিষ্কের ‘মোটর কর্টেক্স’ বা মস্তিষ্কের যে অংশ নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে তা থেকে আসা বিভিন্ন সংকেত পড়তে এবং সেগুলোকে নির্দেশে রূপান্তর করে রোবোটিক হাতও নাড়াতে পেরেছে।
কয়েক দশক পেরিয়ে এসব ডিভাইস এখন কেবল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা মানুষের ওপর পরীক্ষার পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর কারণ, মস্তিষ্কের ভেতর স্থায়ীভাবে কোনো কিছু বসানো বা ইমপ্ল্যান্ট করা এবং সেটিকে নিরাপদ রাখা অত্যন্ত কঠিন।
অধ্যাপক ডনোহিউ বলেছেন, ডিভাইসের উত্তাপ ও সংক্রমণের ঝুঁকিই বড় বাধা।
“আপনার ফোনে প্রসেসর থাকলে সেটি যেমন খুব গরম হয়ে যায় তেমনই এ ইলেকট্রনিক ডিভাইসের প্রসেসরও গরম হয়ে ওঠে। আর, মানুষের মস্তিষ্ক কেবল এক বা দুই ডিগ্রি তাপমাত্রার পরিবর্তন সহ্য করতে পারে।”
তিনি বলেছেন, নিউরালিংকের মতো বিশাল অর্থায়নপুষ্ট কোম্পানিগুলো খুব শিগগিরই পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিদের সাহায্যের জন্য এ ডিভাইসের আইনি অনুমোদন পেয়ে যাবে।
“আমার ধারণা, এখন চূড়ান্ত এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি আমরা। আপনি যদি কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ বা কথা বলার সক্ষমতা ফিরে পেতে চান তবে আমি এমন কোনো কারণ দেখি না যে এটি অসম্ভব কিছু থেকে যাবে। কেউ যদি একবার এমন অনুমোদিত ডিভাইস তৈরি করতে পারে তবে আমরা খুব দ্রুতই এ প্রযুক্তির সুফল দেখতে পাব।”





















