উপর–নিচ কিংবা ডানে–বামে—আপনার সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে সাড়া দিচ্ছে আপনার ফোনের ক্যামেরা; ভাবা যায়? ঠিক এমনই এক নতুন ধরনের স্মার্টফোন উন্মোচন করেছে এআই ডিভাইস ইকোসিস্টেম কোম্পানি অনার। তারা এটিকে বলছে ‘রোবট ফোন’—স্মার্টফোনের এক নতুন ধরণ।
এ বছর বার্সেলোনায় অনুষ্ঠিত মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল প্রতিষ্ঠানটি। কেবল হার্ডওয়্যারনির্ভর স্মার্টফোনের সীমা ছাড়িয়ে রোবোটিক্স ও সমন্বিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ডিভাইসের ভেতরে যুক্ত করার ধারণা সামনে এনে প্রযুক্তি দুনিয়ায় নতুন আলোচনা শুরু করেছে অনার।
এই ধারণারই বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে প্রদর্শনীতে তুলে ধরা হয়েছে তাদের নতুন ‘রোবট ফোন’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শক্তিশালী ‘সুপার ব্রেইন’ ও ‘এমবডিড এআই’ ইন্টারঅ্যাকশনের সমন্বয়ে তৈরি এই ডিভাইস স্মার্টফোনকে আরও গতিশীল ও ইন্টারঅ্যাকটিভ অভিজ্ঞতায় রূপ দিতে পারে।
আরও সহজভাবে বললে, অনারের এই নতুন ধরনের ফোনে রয়েছে একটি রোবোটিক ক্যামেরা, যা ফোনের বডি থেকে বেরিয়ে আসে এবং সাবজেক্টের নড়াচড়া অনুযায়ী মানুষের ঘাড়ের মতো ঘুরে নড়াচড়া করতে পারে। ফোনটিতে রয়েছে ২০০ মেগাপিক্সেলের সেন্সর এবং থ্রি-এক্সিস গিম্বল স্ট্যাবিলাইজেশন, যার মাধ্যমে ধারণ করা যায় নিখুঁত ভিডিও ও ৩৬০ ডিগ্রি ভিডিও কল। ব্যবহারকারী হাঁটছেন, দৌড়াচ্ছেন বা যেকোনো ধরনের শারীরিক নড়াচড়ার সময়ও ফোনটির এআইচালিত মাইক্রোমোটর ও গিম্বল ক্যামেরাকে সাবজেক্টের ওপর স্থির রাখতে সাহায্য করে।
শুধু তা–ই নয়, অনারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশ্বখ্যাত সিনেমা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যারি। তাদের ইমেজিং সায়েন্স ও ভিডিও প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে এই ‘রোবট’ ফোনে। অনারের পরবর্তী স্মার্টফোনগুলোতেও এ প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এখানেই শেষ নয়। মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে ফোল্ডেবল স্মার্টফোন সেগমেন্টের অন্যতম শক্তিশালী ও পাতলা ফ্ল্যাগশিপ ফোন ম্যাজিক ভি৬–ও প্রদর্শন করেছে অনার। ভাঁজ করা অবস্থায় ফোনটির পুরুত্ব মাত্র ৮ দশমিক ৭৫ মিলিমিটার—হাতে ধরলে এটি যে একটি ফোল্ডেবল ফোন, তা বোঝাই কঠিন। এতে ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে পাতলা ৬ হাজার ৬৬০ মিলিঅ্যাম্পিয়ার ঘণ্টার সিলিকন–কার্বন ব্যাটারি, যা দীর্ঘস্থায়ী চার্জ নিশ্চিত করে। পাশাপাশি এটি বিশ্বের প্রথম ফোল্ডেবল ফোন, যা স্ন্যাপড্রাগন এইট এলিট জেন ফাইভ প্রসেসর দ্বারা পরিচালিত।
প্রযুক্তি প্রদর্শনীর আরেকটি আলোচিত দিক ছিল অনারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। প্রতিষ্ঠানটির এসব বৈপ্লবিক উদ্ভাবনের মূল চালিকাশক্তি হলো তাদের ‘আলফা প্ল্যান’। গত বছর উন্মোচন করা এই পরিকল্পনা ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বাজেটের পাঁচ বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প। এর লক্ষ্য, অনারকে একটি প্রথাগত স্মার্টফোন কোম্পানি থেকে বৈশ্বিক শীর্ষস্থানীয় এআই ডিভাইস ইকোসিস্টেম কোম্পানিতে রূপান্তর করা। এই পরিকল্পনার একটি বড় অংশ হলো ‘অগমেন্টেড হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স’।
এই ভিশনেরই বাস্তব প্রতিফলন হিসেবে মোবাইল ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে অনার তাদের প্রথম হিউম্যানয়েড রোবটও প্রদর্শন করেছে। রোবটটি মূলত স্মার্টফোন, পিসি ও পরিধেয় ডিভাইসের মধ্যে একটি সমন্বিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রতীক। এটি শুধু মানুষের কাজই করবে না, বরং মানুষের আবেগ বুঝতে পারবে, সঙ্গী হিসেবে কথা বলবে এবং কেনাকাটার সহকারী হিসেবেও সাহায্য করবে। এমনকি রোবটটি নাচতেও পারে—এর ভিডিও ইতিমধ্যে ইন্টারনেট দুনিয়ায় ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
ডিভাইস ইন্ডাস্ট্রির চিরচেনা প্রথা ভেঙে যে এআই বিপ্লব শুরু হয়েছে, অনারের আলফা প্ল্যান তারই প্রতিফলন। স্মার্টফোন থেকে ট্যাবলেট—প্রতিটি যন্ত্রের মধ্যে একটি মানুষকেন্দ্রিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব উদ্যোগ কেবল অনারের উৎপাদনশীলতাই বাড়াবে না, বরং মোবাইল শিল্পে ভবিষ্যতের জন্য নতুন একটি মানদণ্ডও তৈরি করতে পারে।





















