এই তীব্র তাপপ্রবাহে একটু শীতল প্রশান্তির আশায় হাজার হাজার টাকা খরচ করে হায়ার (Haier) ব্র্যান্ডের এসি কিনছেন গ্রাহকরা। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির চাকচিক্যের আড়ালে হায়ারের ‘বিক্রয়োত্তর সেবা’ বা আফটার সেলস সার্ভিসের কঙ্কালসার অবস্থা এখন জনভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্সটলেশনে দীর্ঘসূত্রতা, কল সেন্টারের উদাসীনতা এবং টেকনিশিয়ানদের অদক্ষতায় স্বস্তির বদলে গ্রাহকের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ।
হায়ার তাদের বিজ্ঞাপনে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন মিলছে না। গ্রাহক আব্দুর রহমান রঙ্গন জানান, অনলাইন শপ ‘পিকাবু’ থেকে হায়ারের ‘জেনগ্লো’ এসি কিনে কল করার পরও ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও কেউ যোগাযোগ করেনি। অন্যদিকে, গ্রাহক মো. হাবিবুর রহমানের অভিযোগ আরও গুরুতর। কল সেন্টারে অভিযোগ জানানোর এক সপ্তাহ পরও সার্ভিস টিমের দেখা পাননি তিনি। ভুক্তভোগীদের দাবি, কাস্টমার কেয়ার প্রতিনিধিরা কেবল ‘নোট ডাউন’ করা ছাড়া কার্যকর কোনো সমাধান দিতে পারছেন না।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হায়ারের টেকনিশিয়ানদের কারিগরি অদক্ষতা অনেক ক্ষেত্রে এসির ক্ষতি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। রাজেশ পাল নামের এক গ্রাহক জানান, ওয়ারেন্টি থাকা সত্ত্বেও তাঁর এক টন ইনভার্টার এসি ঠিক করতে এসে টেকনিশিয়ানরা হিতে বিপরীত করেছেন। তিনবার সার্ভিসিং এবং গ্যাস চেঞ্জ করার পরও এসি ঠান্ডা তো হয়ইনি, উল্টো ইনডোর ইউনিট থেকে পানি পড়া শুরু হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ইনডোর ও আউটডোর দুটি ইউনিটই খুলে নিয়ে গেছে সার্ভিস টিম। এখন কল সেন্টারে যোগাযোগ করলে কেবল ‘জানাবো’ বলে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে উঠে আসা মূল সমস্যাগুলো:
১. পার্টস সংকট: অনেক গ্রাহককে জানানো হচ্ছে মাদারবোর্ড বা পিসিবি (PCB) স্টকে নেই। ‘ইম্পোর্ট’ হওয়ার দোহাই দিয়ে মাসের পর মাস গ্রাহককে বসিয়ে রাখা হচ্ছে।
২. হিডেন চার্জের আতঙ্ক: ফ্রি সার্ভিসের প্রতিশ্রুতি থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে টেকনিশিয়ানরা যাতায়াত ভাড়া বা অন্যান্য অজুহাতে বাড়তি টাকা দাবি করছেন।
৩. অদক্ষ টেকনিশিয়ান: চুক্তিবদ্ধ অনেক টেকনিশিয়ানের ইনভার্টার প্রযুক্তির আধুনিক সেন্সর বা লিক শনাক্ত করার মতো পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। ফলে লিক না সারিয়েই বারবার গ্যাস চার্জ করে গ্রাহকের পকেট কাটা হচ্ছে।
৪. পিক সিজনে জনবল সংকট: তীব্র গরমে এসির চাহিদা বাড়লেও হায়ারের সার্ভিস নেটওয়ার্ক সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে অতিরিক্ত কাজের চাপে টেকনিশিয়ানরা দায়সারাভাবে কাজ শেষ করছেন।
বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হায়ার তাদের বিপণন ও বিক্রয় বাড়াতে যতটা মনোযোগী, সেবা কেন্দ্র বা লজিস্টিক সাপোর্টে ততটাই পিছিয়ে। এই গরমের মৌসুমে এসি খুলে নিয়ে যাওয়া বা এক সপ্তাহ দেরি করা মানে গ্রাহকের সাথে এক ধরনের প্রতারণা। এসির বাজারে টিকে থাকতে হলে কেবল বিক্রয় সংখ্যা বাড়ালে চলবে না, বিক্রয়োত্তর সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, তীব্র গরমে গ্রাহকের এই অসন্তোষ অচিরেই ব্র্যান্ডের বড় ধসের কারণ হতে পারে।



















