দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে এক বড় ধরনের ব্যবসায়িক মন্দার মুখে পড়েছে শীর্ষ মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন (GP)। ২০২৫ সালের চূড়ান্ত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক আয় এবং নিট মুনাফা দুটোই আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিম নিবন্ধন নীতিমালার দোহাই দিয়ে গ্রামীণফোন তাদের গ্রাহক ও রাজস্ব কমার দায় এড়াতে চাইলেও, সাধারণ গ্রাহকদের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভোক্তাদের মতে— দুর্বল নেটওয়ার্ক সেবা, কল ড্রপ এবং ভয়েস ও ডেটার অতিরিক্ত মূল্যবৃদ্ধির কারণেই সাধারণ মানুষ গ্রামীণফোনের সিম ব্যবহার বন্ধ বা বাতিল করছেন।
অপারেটরটির প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত বছর গ্রামীণফোনের মোট আয় এর আগের বছরের তুলনায় শূন্য দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে তাদের নিট মুনাফায়; গ্রামীণফোনের নিট মুনাফা এক ধাক্কায় ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ কমে গেছে।
গ্রাহকসংখ্যার বড় পতনই মূলত আর্থিক খতিয়ানে এই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বছর শেষে গ্রামীণফোনের মোট সক্রিয় গ্রাহকসংখ্যা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৮ কোটি ৩৯ লাখে এসে দাঁড়িয়েছে। সাধারণত গ্রাহক ও তাদের খরচ বাড়লে কোম্পানির আয় ও মুনাফা বাড়ে, আর গ্রাহকসংখ্যা কমে গেলে মুনাফায় তার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে—যার স্পষ্ট প্রমাণ জিপির এই প্রতিবেদন।
গ্রাহক ও রাজস্ব হ্রাসের পেছনে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর একটি নতুন নিয়মকে প্রধান কারণ হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ। বছরের শেষ প্রান্তিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি প্রতিটি জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিপরীতে সিমের সর্বোচ্চ নিবন্ধনসীমা ১৫টি থেকে কমিয়ে ১০টি নির্ধারণ করে। এর ফলে গ্রাহকদের নামে থাকা অতিরিক্ত সিমগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
টেলিকম অপারেটরটি বিটিআরসির নীতিমালার ওপর দায় চাপাতে চাইলেও সাধারণ গ্রাহকেরা বলছেন ভিন্ন কথা। মাঠপর্যায়ের গ্রাহকদের অভিযোগ, গ্রামীণফোনের ইন্টারনেট ও ভয়েস কলের মূল্য এখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। চড়া দাম দিয়েও অনেক এলাকায় ফোর-জি তো দূরের কথা, ঠিকমতো নেটওয়ার্কের সিগন্যালই পাওয়া যায় না; ইনডোর নেটওয়ার্ক এবং কল ড্রপের সমস্যা দীর্ঘদিনের।
ভোক্তাদের দাবি, একটি এনআইডির অধীনে সিমের সংখ্যা ১০টিতে নামিয়ে আনার সরকারি নির্দেশ আসার পর, তারা যখন বাধ্য হয়ে বাড়তি সিম বন্ধ করতে গেছেন, তখন দুর্বল নেটওয়ার্ক ও চড়া মূল্যের কারণে সিম বাতিলের তালিকায় সবার আগে গ্রামীণফোনের সংযোগটিই রেখেছেন। সাধারণ মানুষের এই বর্জনের ফলেই মূলত জিপির গ্রাহক সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
গ্রাহকদের খরচের ধরন বিশ্লেষণ করে গ্রামীণফোনের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভয়েস ও ডেটা (ইন্টারনেট) থেকে কোম্পানির সার্বিক আয় কমে গেছে। ফলে গ্রাহকপ্রতি গড় আয় (ARPU) ১৫৫ টাকা থেকে কমে ১৫১ টাকায় নেমে এসেছে।
বছর শেষে গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্কের ভেতরে থাকা ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের পরিসংখ্যান নিচে দেওয়া হলো:
মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারী: ৪ কোটি ৮৭ লাখ
মোট গ্রাহকের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (%): ৫৮ শতাংশ
মোট ফোর-জি (4G) গ্রাহক: ৪ কোটি ৪৬ লাখ
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গ্রামীণফোনের মোট সক্রিয় গ্রাহকের একটি বড় অংশ (৪২ শতাংশ) এখনো ফোর-জি বা ইন্টারনেট সেবার বাইরে রয়েছে, যা বর্তমান স্মার্ট বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অপারেটরটির ডেটা বাজারের এক ধরনের স্থবিরতা নির্দেশ করে।


















