তিন বছরের বেশি সময় স্থগিত থাকার পর আবারও অবৈধ মোবাইল হ্যান্ডসেটের বিপণন, বিক্রি ও বিতরণের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।
সম্প্রতি কমিশনের এক বৈঠকে বিটিআরসির এনফোর্সমেন্ট অ্যান্ড ইন্সপেকশন (ইঅ্যান্ডআই) অধিদপ্তরের প্রস্তাবের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মোবাইল ফোনের পাশাপাশি অবৈধ রেডিও, ওয়্যারলেস এবং অন্যান্য টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতির বিরুদ্ধেও অভিযান জোরদার করা হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
২০২৩ সাল থেকে বন্ধ ছিল অভিযান
বিটিআরসি দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে অবৈধ হ্যান্ডসেট ও অননুমোদিত টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে আসছিল।
তবে ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে অবৈধ মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। যদিও সিগন্যাল জ্যামার, রিপিটার, বুস্টার এবং অবৈধ ভিওআইপি সরঞ্জামের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান ছিল।
বিটিআরসির নথি অনুযায়ী, ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) সিস্টেম বাস্তবায়নের প্রস্তুতি এবং ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের কারণে অভিযান স্থগিত রাখা হয়েছিল।
NEIR চালু হলেও ব্লকিং কার্যকর হয়নি
২০২১ সালে চালু হওয়া NEIR সিস্টেমের মাধ্যমে মোবাইল ফোনের IMEI নম্বরকে জাতীয় পরিচয়পত্র ও সিম নিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে সংযুক্ত করে বৈধ ডিভাইস শনাক্ত করার পরিকল্পনা ছিল।
এ ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য ছিল অবৈধ বা অননুমোদিত হ্যান্ডসেট নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করা।
তবে বাস্তবে অবৈধ হ্যান্ডসেট ব্লকিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাগুলো কখনও চালু করা হয়নি। ফলে সিস্টেমটি অনেকটাই নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে থাকে।
বিটিআরসির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সম্প্রতি প্ল্যাটফর্মটির কিছু কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হলেও হ্যান্ডসেট ব্লকিংয়ের বিষয়টি এখনও সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে।
দ্রুত বাড়ছে গ্রে-মার্কেট
বিটিআরসি বলছে, বিভাগীয় শহর, সিটি করপোরেশন এলাকা এবং জেলা শহরগুলোতে অবৈধ মোবাইল ফোন ও ওয়্যারলেস ডিভাইসের আমদানি, সংযোজন, বিপণন ও বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
এসব কার্যক্রম বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্বল নজরদারি, টাকার অবমূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক বাজারে যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধি এবং বারবার শুল্ক ও কর বৃদ্ধির কারণে দেশে গ্রে-মার্কেট দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে।
বিশেষ করে স্মার্টফোনের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক ক্রেতা অনানুষ্ঠানিক বাজারের দিকে ঝুঁকছেন।
শিল্পখাতের তথ্য ও বিটিআরসির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট মোবাইল ফোন বাজারের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশই গ্রে-মার্কেটের দখলে। প্রায় ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এই বাজারে ২০২৫ সালের মধ্যে অবৈধ অংশের পরিমাণ ৭০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রিমিয়াম ফোনের বড় অংশই আসছে অনানুষ্ঠানিক পথে
স্যামসাংয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে গ্রে-মার্কেট আমদানি ২০২২ সালের ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে।
একই সময়ে একটি ব্র্যান্ডের প্রায় ৯৩ শতাংশ প্রিমিয়াম স্মার্টফোন এবং প্রায় ৬৯ শতাংশ মধ্যম মানের ফোন অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলের মাধ্যমে বাজারে এসেছে বলে জানিয়েছে শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র।
রাজস্ব ও নিরাপত্তা ঝুঁকি
বিটিআরসি বলছে, অবৈধ হ্যান্ডসেট শুধু সরকারের রাজস্ব ক্ষতিই করছে না, বরং টেলিযোগাযোগ নিরাপত্তা ও নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনাতেও জটিলতা তৈরি করছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মতে, এসব ডিভাইস অনেক সময় মান নিয়ন্ত্রণ ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ার বাইরে থাকায় ভোক্তারাও নিম্নমানের পণ্য কিনে প্রতারিত হচ্ছেন।
অন্যদিকে বৈধ আমদানিকারক ও স্থানীয় উৎপাদকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।
আবার শুরু হবে যৌথ অভিযান
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিটিআরসির ইঅ্যান্ডআই অধিদপ্তর র্যাব, পুলিশ এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সমন্বয়ে দেশব্যাপী যৌথ অভিযান পুনরায় শুরু করার প্রস্তাব দিয়েছে।
কমিশন নীতিগতভাবে সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাওয়ার পর উপযুক্ত সময়ে সারা দেশে অভিযান শুরু হবে।




















