মাইক্রোসফট, অ্যাপল ও গুগলের মতো প্রযুক্তি জায়ান্টরা ব্র্যান্ডের প্রচারণায় এ কৌশল ব্যবহার শুরু করেছে। বাজার গবেষকদের মতে, সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের আরো বেশি বন্ধুবৎসল ও সহজলভ্য হিসেবে তুলে ধরতেই প্রতিষ্ঠানগুলো এ প্রাচীন কিন্তু কার্যকর বিপণন কৌশল আবার ফিরিয়ে আনছে। খবর বিবিসি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সাধারণ গ্রাহকদের এক ধরনের অনাস্থা তৈরি হয়েছে। অনেক ব্যবহারকারীই এ কোম্পানিগুলোকে অনুভূতিহীন এবং কেবলই বাণিজ্যিক একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে দেখে থাকে। এ নেতিবাচক ভাবমূর্তি কাটিয়ে ওঠার জন্য একটি আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত কার্টুন চরিত্র বেশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিপণন বিশেষজ্ঞরা। একটি সুন্দর মাসকট খুব সহজেই মানুষের মন ছুঁয়ে যেতে পারে এবং কোম্পানির প্রতি গ্রাহকদের একঘেয়েমি দূর করতে সাহায্য করে।
সম্প্রতি বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নতুন মাসকট উন্মোচন করেছে। অ্যাপল নতুন ল্যাপটপের প্রচারণার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বড় মাথার একটি নীল-সাদা কার্টুন চরিত্র নিয়ে এসেছে, যা এরই মধ্যে নেটিজেনদের মাঝে ‘লিটল ফাইন্ডার গাই’ নামে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। অন্যদিকে মাইক্রোসফট তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট কোপাইলটের জন্য ‘মিকো’ নামের একটি মাসকট তৈরি করেছে। হাসিমুখের এ মিকো এআইয়ের সঙ্গে মানুষের কথোপকথনকে আরো সহজ ও স্বাভাবিক করে তোলে। উল্লেখ্য, বহু বছর আগে মাইক্রোসফটের ‘ক্লিপি’ নামের একটি পেপারক্লিপ অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল, যা ব্যবহারকারীদের পছন্দ না হওয়ায় একপর্যায়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।
অন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের পুরনো চরিত্রগুলোকে নতুন করে সাজাচ্ছে। গুগল তাদের জনপ্রিয় সবুজ রঙের অ্যান্ড্রয়েড রোবট মাসকটটিতে বড় পরিবর্তন এনেছে। এখন ব্যবহারকারীরা চাইলে নিজেদের পোশাক বা চুলের স্টাইলের সঙ্গে মিলিয়ে এ রোবটটিকে সাজিয়ে নিতে পারেন। প্রযুক্তিভিত্তিক অনলাইন ফোরাম রেডিট তাদের এলিয়েন মাসকট স্নোকে আগের চেয়ে আরো বেশি জীবন্ত করে তুলেছে। এছাড়া মজিলা ফায়ারফক্স ব্রাউজার তাদের লোগোটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ মাসকটে রূপান্তর করেছে, যার নাম দেয়া হয়েছে কিট। মজিলার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গুগল ক্রোম বা অ্যাপল সাফারির মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে নিজেদের আলাদা ও আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপন করতেই তারা কার্টুন চরিত্রটি এনেছেন।
২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের বিপণন কার্যক্রমে মাসকট ব্যবহার করে, তারা অন্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বাজারের হিস্যা ৩৭ শতাংশ বেশি বাড়াতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ চরিত্রগুলো একটি কাঠখোট্টা ও যান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে মানুষের মতো একটি চেহারা, কণ্ঠ ও ব্যক্তিত্ব দেয়। ভাষা শেখার জনপ্রিয় অ্যাপ ডুওলিঙ্গোর সবুজ পেঁচা ডুও এর একটি বড় উদাহরণ। এ চরিত্রের কারণে টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে অ্যাপটির কোটি কোটি ফলোয়ার তৈরি হয়েছে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, কার্টুন চরিত্রের এ সাফল্যের পেছনে মানুষের স্বভাবজাত কিছু জৈবিক বৈশিষ্ট্য কাজ করে। মাসকটগুলো সাধারণত বড় মাথা এবং বড় চোখের আদলে তৈরি করা হয়, যা মানুষের অবচেতন মনে একটি শিশুর প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তোলে। এর ফলে মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি স্নেহ ও ভালোবাসার অনুভূতি তৈরি হয়। ছোটবেলা থেকে কোনো ব্র্যান্ডের মাসকট দেখে বড় হলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও সেই ব্র্যান্ডের প্রতি মানুষের মনে একটি উষ্ণ ও পরিচিত অনুভূতি থেকে যায়।
প্রযুক্তির সঙ্গে এ মাসকটের মিশ্রণ নিয়ে প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও মনোবিজ্ঞানীদের মনে কিছু আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এআই যখন এ চরিত্রগুলোকে মানুষের সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সরাসরি কথা বলার সুযোগ করে দেবে, তখন প্রতিষ্ঠানগুলো এর মাধ্যমে গ্রাহকদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এ কৃত্রিম মাসকটগুলো হয়তো একসময় মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট পণ্য কিনতে বা কোনো কাজ করতে প্ররোচিত করবে, যা মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় এক ধরনের সূক্ষ্ম হস্তক্ষেপ হতে পারে।
পণ্যের প্রচারে মাসকটের ব্যবহার কিন্তু নতুন কিছু নয়। উনিশ শতকে বিভিন্ন খেলোয়াড় দল প্রথম এর ব্যবহার শুরু করে এবং ১৯৬০-এর দশকে করপোরেট বিপণনে এটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তবে একপর্যায়ে বাজারে মাসকটের আধিক্য বেড়ে যাওয়ায় মানুষ বিরক্ত হয়ে পড়ে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো এর ব্যবহার কমিয়ে দেয়।
বর্তমান সময়ে কেবল প্রযুক্তি খাতই নয়, পেঙ্গুইন বুকসের মতো ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা সংস্থাও তাদের আইকনিক পেঙ্গুইন লোগোটিকে নতুন ইলাস্ট্রেশনের মাধ্যমে ডিজিটাল মাধ্যমে আরো আকর্ষণীয় করে তুলছে।
বয়স্ক বা অভিজ্ঞ গ্রাহকরা এই কার্টুন চরিত্রগুলোকে বিজ্ঞাপনী কৌশল হিসেবে দেখলেও তরুণ বা অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর এর প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। তবে ব্যবহারকারীদের সুবিধার কথা চিন্তা করে মাইক্রোসফটের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান এই মাসকট ব্যবহারের বিষয়টি ঐচ্ছিক রেখেছে, অর্থাৎ কেউ না চাইলে কার্টুন চরিত্রটি বন্ধ করে সাধারণ মোডেই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারবেন।





















