বাংলাদেশে বর্তমানে ৪৪০টিরও বেশি স্থানে সীমিত পরিসরে ৫জি সেবা চালু রয়েছে। এ সেবা আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও চলছে। তবে কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও উৎপাদন খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর প্রস্তুতির ওপরই দেশে পূর্ণাঙ্গ ৫জি সেবা চালু অনেকাংশে নির্ভর করবে বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ৫জি প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে উপযোগী খাতগুলো চিহ্নিত করার কাজ চলছে। একই সঙ্গে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, স্পেকট্রাম পরিকল্পনা, ট্রান্সমিশন ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ বৃদ্ধি কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, বাণিজ্যিক পর্যায়ে ৫জি সেবা চালুর প্রক্রিয়া এখনও চলমান। তবে রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকা, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, রেস্তোরাঁসহ প্রায় ৪০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ইতোমধ্যে ৫জি সেবা চালু হয়েছে। এছাড়া ঢাকার বাইরে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, খুলনা ও সিলেট বিভাগের ৪০০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সীমিত পরিসরে ৫জি সেবা দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, শুধু নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করলেই হবে না; ৫জি প্রযুক্তির পূর্ণ সুফল পেতে হলে সংশ্লিষ্ট শিল্প ও সেবা খাতগুলোকেও এ প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। তাই দেশের বাস্তবতায় কোন কোন খাত ৫জি প্রযুক্তি ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে, তা নির্ধারণে কাজ চলছে।
৫জি বাস্তবায়নের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ট্রান্সমিশন অবকাঠামো শক্তিশালী করা হচ্ছে। ‘৫জি সক্ষমতার জন্য বিটিসিএল অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় দেশের ৬৪ জেলা ও সংশ্লিষ্ট উপজেলাকে ব্যাকআপ অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলের মাধ্যমে সংযুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি জেলা থেকে জেলা এবং জেলা থেকে উপজেলায় উচ্চগতির ব্যান্ডউইথ সরবরাহে এএসওএন-সক্ষম ডিডব্লিউডিএম প্রযুক্তি স্থাপন করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগরীতেও ব্যাকআপ সংযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।
তিনি জানান, অপটিক্যাল ফাইবার ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপনের প্রায় ৭৯ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে ৫জি সম্প্রসারণের জন্য আরও শক্তিশালী অবকাঠামো তৈরি হবে।
৫জি সম্প্রসারণের জন্য সরকার ইতোমধ্যে ২.৩ গিগাহার্টজ ও ২.৬ গিগাহার্টজ ব্যান্ড থেকে প্রয়োজনীয় স্পেকট্রাম বরাদ্দ দিয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) একটি দীর্ঘমেয়াদি স্পেকট্রাম রোডম্যাপ প্রণয়ন করেছে। এর আওতায় ২০২৭ সালে ৩.৫ গিগাহার্টজ ব্যান্ডে নতুন স্পেকট্রাম উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সেবার মান উন্নয়ন ও গ্রাহকবান্ধব মূল্য নিশ্চিত করতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার ইন্টারনেটের মূল্য পুনর্নির্ধারণ করেছে এবং কোয়ালিটি অব সার্ভিস (QoS) ও কোয়ালিটি অব এক্সপেরিয়েন্স (QoE) মানদণ্ড চালু করেছে। এসব মানদণ্ডে সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করতে জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে।
প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের লক্ষ্যে রাষ্ট্রীয় মোবাইল অপারেটর টেলিটক দুটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এসব প্রকল্পের আওতায় ৩ হাজার ৪২০টি স্থানে উচ্চগতির ৪জি সরঞ্জাম স্থাপন করা হবে। টেলিটক ইতোমধ্যে ভয়েস ওভার ওয়াই-ফাই (ভিওওয়াইফাই), ভয়েস ওভার এলটিই (ভিওএলটিই) চালু করেছে এবং চারটি স্থানে পরীক্ষামূলক ৫জি সেবাও চালু করেছে।
আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হচ্ছে। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল পিএলসি (বিএসসিপিএলসি) বর্তমানে সি-মি-উই-৪ ও সি-মি-উই-৫ সাবমেরিন কেবল ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ৭ হাজার ২২০ জিবিপিএস সক্ষমতা অর্জন করেছে। বর্তমানে এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ১০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ ব্যবহৃত হচ্ছে।
এ ছাড়া সি-মি-উই-৬ কনসোর্টিয়ামের আওতায় দেশের তৃতীয় সাবমেরিন কেবল স্থাপনের কাজও এগিয়ে চলছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রকল্পটি শেষ হলে আরও ৩০ হাজার জিবিপিএস ব্যান্ডউইথ যুক্ত হবে। ফলে বাংলাদেশের মোট আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা প্রায় ৩৮ হাজার জিবিপিএসে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা বৃদ্ধি পেলে দেশে ব্যাপক পরিসরে ৫জি সেবা চালুর ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটরদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। তবে পূর্ণাঙ্গ ৫জি সেবায় উত্তরণ শুধু অবকাঠামো, ক্যাবল নেটওয়ার্ক বা স্পেকট্রাম প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করবে না; বরং কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও শিল্পখাতসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো এই প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহারে কতটা প্রস্তুত, সেটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।


















