‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ স্লোগানে গত এক দশকে দেশের অভ্যন্তরে যে স্মার্টফোন ও ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন শিল্প গড়ে উঠেছিল, তা এখন এক নজিরবিহীন ও গভীর সংকটের মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক বাজারে সেমিকন্ডাক্টর বা মেমোরি চিপের চরম সরবরাহ ঘাটতি এবং কাঁচামালের আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল কারখানাগুলো (যেমন—সিম্ফনি, ওয়ালটন ইত্যাদি) মারাত্মক আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছে। কাঁচামাল সংকটে বহু কারখানার উৎপাদন লাইনের একটি বড় অংশ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ রেকর্ড পরিমাণে বাড়ছে, অন্যদিকে বাজারে হ্যান্ডসেটের সরবরাহ ও বিক্রি আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে।
এই খাতের সংকট এবং দেশীয় কারখানাগুলোর ভেতরের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে প্রযুক্তি ব্যবসায়ী ও এডিসন গ্রুপের (সিম্ফনি মোবাইল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকারিয়া শহীদ বলেন, আন্তর্জাতিক চিপ সরবরাহকারী এবং সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারাররা সবসময় বৈশ্বিক জায়ান্টদের অগ্রাধিকার দেয়। স্যামসাং, অ্যাপল বা শাওমির মতো বিশ্বখ্যাত বড় ব্র্যান্ডগুলোর বিপুল পরিমাণ (কোয়ান্টিটি) অর্ডারের চাপ সামাল দিতেই আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা ব্যস্ত থাকে।
তিনি উল্লেখ করেন, “যেহেতু গ্লোবাল ব্র্যান্ডগুলোর তুলনায় আমাদের দেশীয় কারখানাগুলোর একক অর্ডারের আকার বা কোয়ান্টিটি অনেক ছোট, তাই বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের এই বিপর্যয়ে আমাদের স্থানীয় কারখানাগুলোই সবচেয়ে বেশি বৈষম্য ও ডিরাপশনের (যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা) শিকার হচ্ছে। আমরা টাকা দিয়েও সময়মতো চিপ বা প্যানেল পাচ্ছি না।”
খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটি মোবাইল কারখানা সচল রাখতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ নির্দিষ্ট খরচ (ফিক্সড কস্ট) বহন করতে হয়। সময়মতো কাঁচামাল ও চিপ না পাওয়ায় কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিক-কর্মচারীদের মাসিক বেতন, কারখানার বিশাল পরিচালন ব্যয় এবং ব্যাংক ঋণের চড়া সুদ পরিশোধ করা থামছে না। উৎপাদন ও বিক্রি না থাকায় এই পুরো খরচটিই এখন দেশি উদ্যোক্তাদের পকেট থেকে দিতে হচ্ছে, যার ফলে প্রতি মাসেই কোটি কোটি টাকা লোকসান গুনছে প্রতিষ্ঠানগুলো। এভাবে চলতে থাকলে দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা এই হাই-টেক শিল্পখাতে বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই এবং কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাজারে ফাইভ-জি (5G) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির প্রসারের কারণে বিশ্বজুড়ে মেমোরি চিপের চাহিদা এখন তুঙ্গে। কিন্তু সেই তুলনায় সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনকারী দেশগুলো (যেমন—তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন) বৈশ্বিক চাহিদা পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছে। এই ঘাটতির সুযোগে আন্তর্জাতিক বাজারে চিপের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দেশীয় কারখানাগুলো একদিকে বাড়তি দাম দিয়েও চিপ পাচ্ছে না, অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ার কারণে ফোনের দাম বাড়ালে তা সাধারণ ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে বাজারে অবৈধ বা চোরাই পথে আসা বিদেশি হ্যান্ডসেটের দাপট আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই কঠিন পরিস্থিতি এককভাবে স্থানীয় কোনো কোম্পানির পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। শত কোটি টাকার বিনিয়োগে দেশে গড়ে ওঠা এই প্রযুক্তি শিল্পকে অকাল মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে হলে এখনই সরকারের নীতিগত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।



















