কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য জয়জয়কার শুধু সফটওয়্যার চ্যাটবট কিংবা ডেটা সেন্টারের সার্ভার রুমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর বড়সড় নেতিবাচক প্রভাব এবার সরাসরি পড়তে শুরু করেছে সাধারণ ক্রেতাদের পকেটে। বিশ্ববাজারে মেমোরি চিপের তীব্র সংকটের কারণে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ এবং ট্যাবলেটের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। খোদ অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) টিম কুক স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, প্রযুক্তিপণ্যের এই মূল্যবৃদ্ধি এখন ‘অনিবার্য’ এবং আগের পুরোনো মূল্য ধরে রাখা কোনোভাবেই ‘টেকসই নয়’।
বিশ্লেষকদের মতে, ওপেনএআই, গুগল ও মাইক্রোসফটের মতো টেক জায়ান্টদের এআই অবকাঠামো তৈরির অন্ধ প্রতিযোগিতার কারণেই আজ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে গ্লোবাল কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স মার্কেট।
প্রযুক্তি পণ্যের বাজারে আগুন লাগার পেছনের মূল কারণ এবং অ্যাপলের এই চড়া মূল্যবৃদ্ধির ভেতরের খবর চলুন এক নজরে জেনে নেওয়া যাক:
টিম কুকের এই ঘোষণার প্রতিফলন ইতিমধ্যেই অ্যাপলের প্রাইসিং লিস্টে দেখা গেছে। বিশ্ববাজারে অ্যাপল তাদের বেশ কয়েকটি বহুল বিক্রিত ডিভাইসের দাম একলাফে অনেকটা বাড়িয়ে দিয়েছে:
১৬ ইঞ্চি MacBook Pro: এই প্রিমিয়াম ল্যাপটপটির দাম একঝাঁকে বেড়েছে ৩০০ মার্কিন ডলার।
১১ ইঞ্চি iPad Air: পূর্বে যেটির প্রারম্ভিক মূল্য ছিল ৫৯৯ ডলার, তা এখন ১৫০ ডলার বেড়ে ঠেকেছে ৭৪৯ ডলারে।
HomePod mini: স্মার্ট স্পিকারটির দাম ৩০ ডলার বেড়ে এখন বিক্রি হচ্ছে ১২৯ ডলারে।
কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির টেপার স্কুল অব বিজনেস-এর অধ্যাপক টিম ডারডেঞ্জার এই সংকটের মূল গাণিতিক সমীকরণটি ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান, এআই ডেটা সেন্টারের সুপার-কম্পিউটারগুলোর জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত উচ্চগতির HBM (High Bandwidth Memory)। চিপ নির্মাতা বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন সেমিকন্ডাক্টর জায়ান্ট মাইক্রন) এখন সাধারণ ল্যাপটপ বা স্মার্টফোনে ব্যবহৃত DDR5 RAM-এর প্রোডাকশন কমিয়ে দিয়ে পুরো ফ্যাক্টরিকে HBM উৎপাদনে কাজে লাগাচ্ছে।
যেহেতু একই মেমোরি চিপ একটি এআই সার্ভারে বিক্রি করলে নির্মাতারা সাধারণ ডিভাইসের তুলনায় বহুগুণ বেশি লাভ বা রেভিনিউ পান, তাই তারা ভোক্তা বাজারের চেয়ে এআই খাতকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ফলে সাধারণ র্যাম ও স্টোরেজের সরবরাহ কমায় এর দাম রকেটের গতিতে বাড়ছে, যার সুবাদে মাইক্রনের মতো চিপ মেকাররা আবার রেকর্ড মুনাফা গুনছে।
বাজার বিশ্লেষক ও সমালোচকদের মনে এখন একটাই বড় প্রশ্ন— অ্যাপল যখন বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ লাভজনক ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানি, তখন তারা কেন এই বাড়তি খরচের পুরো চাপ সরাসরি গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে?
বিভিন্ন বাণিজ্যিক রিপোর্ট অনুযায়ী, হার্ডওয়্যার পণ্যে অ্যাপলের নিজস্ব লাভের মার্জিন (Profit Margin) সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ হয়ে থাকে। এমনকি বর্তমান প্রজন্মের iPhone 17 Pro-এর ক্ষেত্রে এই প্রফিট মার্জিন রেকর্ড ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত! যেখানে পুরো স্মার্টফোন ইন্ডাস্ট্রিতে গড় লাভের মার্জিন সাধারণত ১৫ থেকে ২৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেখানে অ্যাপল চাইলেই এই বাড়তি উৎপাদন খরচ নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে পারত।
ডিজিটাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞ অ্যারি লাইটম্যান মনে করেন, এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে উৎপাদন ব্যয়ের চেয়েও বড় চালিকাশক্তি হলো শেয়ারহোল্ডার বা বিনিয়োগকারীদের চাপ। এআই রেসে অ্যাপল এখনও গুগল বা মাইক্রোসফটের চেয়ে কিছুটা ব্যাকফুটে রয়েছে, পাশাপাশি তাদের নতুন কোনো ক্যাটাগরির প্রোডাক্টও বাজারে বড় সাফল্য পায়নি। এমতাবস্থায় ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের কাছে কোম্পানির আর্থিক গ্রাফ শক্তিশালী দেখাতে অ্যাপল কোনোভাবেই তাদের উচ্চ মুনাফার হার কমাতে রাজী নয়।
মেমোরি সংকটের এই চড়া ঢেউ শুধু অ্যাপল ইকোসিস্টেমে নয়, গ্রাস করেছে পুরো টেক ইন্ডাস্ট্রিকে:
Xbox Console: গেমিং দুনিয়ায় এক্সবক্স কনসোলের কিছু নির্দিষ্ট মডেলের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
Nothing স্মার্টফোন স্থগিত: মেমোরি চিপের চড়া মূল্যের কারণে ট্রেন্ডি ব্র্যান্ড ‘নথিং’ (Nothing) তাদের একটি আসন্ন নতুন স্মার্টফোনের উন্মোচন সাময়িকভাবে স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।
Arduino ও ওপেন সোর্স হার্ডওয়্যার: পিসি ও ডিআইওয়াই (DIY) কিট নির্মাতা আরডুইনো-সহ ছোট-বড় একাধিক হার্ডওয়্যার ডেভেলাপার মেমোরি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা স্বীকার করেছে।





















