প্রিমিয়াম স্মার্টফোনের বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও একধাপ পোক্ত করতে মটোরোলা নিয়ে এসেছে তাদের নতুন ফ্ল্যাগশিপ হ্যান্ডসেট ‘মটোরোলা এজ ৭০ প্রো’ (Motorola Edge 70 Pro)। কার্ভড ওএলইডি ডিসপ্লে বাদ দিয়ে এবার বৈপ্লবিক অ্যামোলেড স্ক্রিন, দানবীয় ব্যাটারি ও শক্তিশালী নতুন চিপসেটের সমন্বয়ে তৈরি এই গ্লোবাল ভ্যারিয়েন্টটির চুলচেরা ল্যাব টেস্ট ও পারফরম্যান্স রিভিউ নিচে তুলে ধরা হলো:
ডিজাইন ও বিল্ড কোয়ালিটি: প্যান্টন কালার ও নজরকাড়া স্লিমনেস
মটোরোলা এজ ৭০ প্রো-এর সবচেয়ে বড় ভিজ্যুয়াল চমক হলো এর ৮.৮ মিমি পুরুত্বের পূর্বসূরি এজ ৬০ প্রো-এর তুলনায় ১ মিমি কমে মাত্র ৭.২ মিলিমিটার স্লিম বডি।
হ্যান্ড ফিল ও টেক্সচার: বিশ্ববিখ্যাত ‘প্যান্টন’ (PANTONE) পার্টনারশিপের অধীনে এটি পাঁচটি বিশেষ রঙে পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের রিভিউ ইউনিটটির ‘জিনফ্যান্ডেল’ (বারগান্ডি ভ্যারিয়েন্ট) রঙের ভেগান লেদার ব্যাক প্যানেলটি হাতে প্রিমিয়াম গ্রিপ দেয়। মিডল ফ্রেমটি প্লাস্টিকের হলেও মটোরোলার নিখুঁত ফিনিশিংয়ের কারণে এটি দেখতে অবিকল মেটালের মতো লাগে।
টেকসই ও সুরক্ষা: ফোনটিতে রয়েছে মিলিটারি-গ্রেড MIL-STD-810H সার্টিফিকেশন এবং পানির চাপ ও নিমজ্জন প্রতিরোধী আইপি৬৮ ও আইপি৬৯ (IP68/IP69) রেটিং। ডিসপ্লের সুরক্ষায় দেওয়া হয়েছে গরিলা গ্লাস ৭আই (Gorilla Glass 7i)।
বক্স সারপ্রাইজ: ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৬-এর অফিশিয়াল পার্টনার মটোরোলা ইইউ (EU) নীতি মেনে বক্সে কোনো চার্জার দেয়নি। তবে সুগন্ধি মাখা এই বক্সের ভেতরে একটি প্রিমিয়াম ৫এ (5A) টাইপ-সি ক্যাবল এবং একটি ম্যাগসেফ (MagSafe) সমর্থিত হার্ড কেস উপহার হিসেবে মিলবে।
(পাঠকদের জন্য সতর্কতা: মটোরোলা এই ফোনের ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট থেকে ৫০ মেগাপিক্সেল টেলিফটো লেন্স এবং ওয়্যারলেস চার্জিং সুবিধা পুরোপুরি বাদ দিয়েছে। তবে ভারতের বাজারে গ্লোবাল ভ্যারিয়েন্টের হুবহু হার্ডওয়্যারটি পাওয়া যাচ্ছে ‘এজ ৭০ প্রো প্লাস’ নামে।)
ডিসপ্লে: ৫২০০ নিটসের অন্ধ করা উজ্জ্বলতা
মটোরোলা এবার পি-ওএলইডি থেকে সরে এসে ৬.৭৮ ইঞ্চির অ্যামোলেড (AMOLED) প্যানেল ব্যবহার করেছে, যার রেজ্যুলুশন ১২৭২ × ২৭৭২ পিক্সেল (৪৫০ পিপিআই)।
উজ্জ্বলতা: ল্যাব টেস্টে ফোনটির উজ্জ্বলতা আমাদের চমকে দিয়েছে। অটো মোডে ১০% উইন্ডো ফিল-এ ডিসপ্লেটি ৩,০০০ নিটসের ওপর এবং সর্বোচ্চ ৫,২০০ নিটস পিক ব্রাইটনেস ছুঁতে পারে, যা কড়া রোদেও ক্রিস্টাল ক্লিয়ার ভিজ্যুয়াল দেয়।
রিফ্রেশ রেট: ফোনটিতে সর্বোচ্চ ১৪৪ হার্জ রিফ্রেশ রেট মিলবে, তবে তা কেবল গেমটাইম ওভারলে-এর ভেতর গেম খেলার সময় সক্রিয় করা যায়। সাধারণ ব্যবহারে এটি এলটিপিএস (LTPS) প্রযুক্তির হওয়ায় ৬০ হার্জ, ৯০ হার্জ ও ১২০ হার্জের মধ্যে মোড ভেদে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওঠানামা করে।
পারফরম্যান্স ও বেঞ্চমার্ক: ডাইমেনসিটি ৮৫০০ এক্সট্রিমের শক্তি
ফোনটিতে ব্যবহৃত হয়েছে ৪ ন্যানোমিটারের শক্তিশালী মিডিয়াটেক ডাইমেনসিটি ৮৫০০ এক্সট্রিম চিপসেট এবং দ্রুতগতির ইউএফএস ৪.১ (UFS 4.1) স্টোরেজ। এজ ৬০ প্রো-এর তুলনায় এটি সিপিইউ-তে প্রায় ৬০% এবং জিপিইউ-তে ৪০% বেশি গতিসম্পন্ন।
বেঞ্চমার্ক স্কোর: গিকবেঞ্চ ৬ (GeekBench 6) ল্যাব টেস্টে এটি সিঙ্গেল-কোরে ১৬৮৩ এবং মাল্টি-কোরে দারুণ স্কোর করেছে। আনটুটু (AnTuTu v11) টেস্টে এর স্কোর দাঁড়িয়েছে ১৭,২০,৯১৬, যা সমসাময়িক পোকো এক্স৮ প্রো-কে অনায়াসে পেছনে ফেলে দেয়।
থার্মাল থ্রটলিং: প্রসেসরের পারফরম্যান্স দুর্দান্ত হলেও গ্রাফিক্স বা জিপিইউ (GPU)-এর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে ফোনটি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং থ্রটলিং-এর কারণে পারফরম্যান্স কিছুটা ড্রপ করে। দীর্ঘক্ষণ গেমিংয়ে ফোনের ব্যাক প্যানেল বেশ ভালো রকম গরম অনুভূত হয়।
ক্যামেরা ও স্পেসিফিকেশন
পেছনের ট্রিপল ক্যামেরা সেটআপে গত বছরের ১০ মেগাপিক্সেল লেন্সের বদলে এবার যুক্ত হয়েছে ৫০ মেগাপিক্সেল পেরিস্কোপ টেলিফটো লেন্স (৩.৫এক্স অপটিক্যাল জুম, OIS), যা দূরের শটগুলোতে দুর্দান্ত ডিটেইলিং দেয়। এছাড়া মূল ৫০ মেগাপিক্সেল (OIS) এবং ৫০ মেগাপিক্সেল আল্ট্রাওয়াইড ক্যামেরা দিয়ে ৪কে@১২০এফপিএস (4K@120fps) পর্যন্ত স্লো-মোশন ভিডিও রেকর্ড করা যায়। সামনেও রয়েছে অটোফোকাসসহ ৫০ মেগাপিক্সেলের সেলফি ক্যামেরা।
ব্যাটারি ও চার্জিং: ৬৫০০ এমএএইচ-এর দীর্ঘস্থায়িত্ব
স্মার্টফোনটি আগের চেয়ে পাতলা হলেও মটোরোলা সিলিকন-কার্বন (Si/C) প্রযুক্তির সাহায্যে ব্যাটারি বাড়িয়ে ৬,৫০০ এমএএইচ করেছে। ল্যাব টেস্টের অ্যাক্টিভ ইউজ স্কোরে ফোনটি প্রায় ১৯ ঘণ্টা ব্যাকআপ দিয়ে পূর্বসূরিকে ধুলোবালি খাইয়েছে। ডিভাইসটি ৯০ ওয়াট টার্বোচার্জিং (PD 3.0 + PPS সমর্থিত) সাপোর্ট করে। আমাদের পরীক্ষায় শূন্য থেকে ১০০% ফুল চার্জ হতে সময় নিয়েছে ৪৯ মিনিট (৩০ মিনিটে ৭৩%)।
সফটওয়্যার: ক্লিন হ্যালো ইউআই ও মোটো এআই
অ্যান্ড্রয়েড ১৬ ভিত্তিক মটোরোলার নিজস্ব ‘হ্যালো ইউআই’ (Hello UI) এককথায় ব্লোটওয়্যার-মুক্ত ও স্টক অ্যান্ড্রয়েডের মতো ক্লিন।
Moto AI ও বাটন: ফোনের বাম পাশে থাকা ডেডিকেটেড ‘মোটো এআই’ বাটন চেপে বা পেছনে ডাবল ট্যাপ করে সরাসরি এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট চালু করা যায়। এটি স্ক্রিন সামারি করা, ভয়েস ট্রান্সক্রিপশন এবং ইমেজ স্টুডিওর মাধ্যমে টেক্সট থেকে ছবি তৈরি করতে পারে।
স্মার্ট কানেক্ট: পিসি ও ট্যাবলেটের সাথে ফাইল ট্রান্সফার, ক্লিপবোর্ড সিঙ্ক ও ডেস্কটপ মোড ব্যবহারের সুবিধা দুর্দান্ত। তবে এর টাইপ-সি পোর্টটি ইউএসবি ২.০ (USB 2.0) হওয়ায় কেবল বা এইচডিএমআই (HDMI) দিয়ে কোনো তারযুক্ত ডিসপ্লে আউটপুট পাওয়া যাবে না, ডিসপ্লে কাস্টিংয়ের জন্য মিরাকাস্ট (Miracast) ওয়ারলেস প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।
আপডেট পলিসি: প্রিমিয়াম ডিভাইস হওয়া সত্ত্বেও মটোরোলা এটিকে তাদের সিগনেচার লাইনের মতো ৭ বছরের সাপোর্ট দেয়নি। এজ ৭০ প্রো-তে মিলবে ৩টি মেজর অ্যান্ড্রয়েড ওএস আপডেট এবং ৫ বছরের সিকিউরিটি প্যাচ।
মটোরোলা এজ ৭০ প্রো একটি অল-রাউন্ডার ফ্ল্যাগশিপ ডিভাইস। যারা চড়া রোদেও উজ্জ্বল ডিসপ্লে, ওজনে হালকা কিন্তু দানবীয় ব্যাটারি ব্যাকআপ, জুম ক্যামেরার চমৎকার পারফরম্যান্স এবং ক্লিন স্টক অ্যান্ড্রয়েড অভিজ্ঞতা খুঁজছেন, তাদের জন্য এটি বর্তমান বাজারের অন্যতম সেরা পছন্দ। তবে দীর্ঘস্থায়ী ভারী গেমিংয়ে কিছুটা গরম হওয়ার প্রবণতা এবং ৩ বছরের ওএস আপডেটের সীমাবদ্ধতা মাথায় রাখা প্রয়োজন।



















