কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির বৈশ্বিক লড়াইয়ে মার্কিন আধিপত্যকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে বিশ্বের বৃহত্তম ‘ওপেন-ওয়েট’ এআই মডেল ‘কিমি কে৩’ (Kimi K3) উন্মোচন করেছে চীনা স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান মুনশট। ২.৮ ট্রিলিয়ন (২ লাখ ৮০ হাজার কোটি) প্যারামিটারের এই বিশাল এআই সিস্টেমটি আমেরিকার শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের সর্বাধুনিক ‘ফেবল’ (Fable) মডেলের সমকক্ষ পারফরম্যান্স দিতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়েছে।
নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে গত মাসে মার্কিন সরকার কর্তৃক অ্যানথ্রোপিকের ফেবল এবং মিথোস (Mythos) মডেলগুলো আকস্মিকভাবে প্রত্যাহার করার ঠিক এক মাসের মাথায় মুনশটের এই ঘোষণা এলো। বিশ্লেষকদের মতে, এই উন্মোচন প্রমাণ করে যে ওপেন-সোর্স এআই ইকোসিস্টেমে চীন কতটা দ্রুত আমেরিকার সাথে প্রযুক্তির ব্যবধান কমিয়ে আনছে।
মুনশট জানিয়েছে, কিমি কে৩ হলো বিশ্বের প্রথম ওপেন-ওয়েট মডেল যা ৩ ট্রিলিয়ন প্যারামিটারের মাইলফলকের কাছাকাছি পৌঁছেছে। জটিল গাণিতিক যুক্তি (Advanced Reasoning), দীর্ঘ কোডিং এবং প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানভিত্তিক কাজের জন্য এটিকে বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। মডেলটিতে রয়েছে ১ মিলিয়ন (১০ লাখ) টোকেনের বিশাল ‘কনটেক্সট উইন্ডো’, যার ফলে এটি একক প্রম্পটেই আগের যেকোনো জেনারেশনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি তথ্য প্রসেস ও মনে রাখতে পারে।
কোম্পানিটির দাবি, জিপিইউ কার্নেল অপ্টিমাইজেশানের (হার্ডওয়্যারের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও লেটেন্সি কমানোর প্রযুক্তি) ক্ষেত্রে কিমি কে৩ মার্কিন মডেল ‘ফেবল ৫’-এর সাথে তীব্র প্রতিযোগিতা করেছে। এছাড়া এটি অ্যানথ্রোপিকের ‘ক্লড ওপাস ৪.৮’ এবং ওপেনএআই-এর ‘জিপিটি ৫.৬ সল’ ও ‘জিপিটি ৫.৫’-এর চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে সেরা পারফরম্যান্স দেখিয়েছে।
তৃতীয় পক্ষের স্বাধীন মূল্যায়নেও মডেলটি শক্তিশালী ফলাফল পেয়েছে। ‘অ্যারেনা ডট এআই’ (Arena.ai) তাদের ওয়েব ইন্টারফেস তৈরির সক্ষমতা যাচাইয়ের সূচকে কিমি কে৩-কে প্রথম স্থান দিয়েছে। অন্যদিকে ‘ভালস এআই’ (Vals AI)-এর র্যাংকিংয়ে এটি ফেবল ৫-এর ঠিক পেছনে থেকে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে।
মুনশটের এই যুগান্তকারী ঘোষণা দেশীয় অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বড় ধাক্কা দিয়েছে। হংকংয়ের শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত এআই প্রতিযোগী কোম্পানি ‘ঝিপু’ (Zhipu)-এর শেয়ারের দর দুপুরের মধ্যেই ২১.৯ শতাংশ এবং ‘মিনিম্যাক্স’ (MiniMax)-এর শেয়ারের দর ১৩.৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
বর্তমানে বিশ্ববাজারে চীনা এআই ফার্মগুলো অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে তাদের নতুন নতুন মডেল বাজারে আনছে। এর আগে জেন জেন ডট এআই (Z.ai)-এর ‘জিএলএম-৫.২’ মডেলটির দুর্দান্ত পারফরম্যান্স পশ্চিমা বিশ্লেষকদের সেই পুরনো ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছিল, যেখানে ভাবা হতো চীনা এআই প্রযুক্তি আমেরিকার চেয়ে অন্তত ছয় মাস পিছিয়ে রয়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, মিনিম্যাক্স কোম্পানিটিও আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যেই তাদের নিজস্ব ২.৭ ট্রিলিয়ন প্যারামিটারের মডেল এবং মাল্টিমোডাল মডেল ‘এইচ৩’ বাজারে আনার পরিকল্পনা করছে।
প্রথাগত ক্লোজড-সোর্স বা স্বত্বাধিকারী মডেলগুলোর মতো না হয়ে, ওপেন-ওয়েট মডেল হওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে যেকোনো ডেভেলপার বা সাধারণ ব্যবহারকারী কিমি কে৩-এর সোর্স কোড ডাউনলোড করে নিজেদের মতো কাস্টমাইজ বা রূপান্তর করে ব্যবহার করতে পারবেন।
আলিবাবা এবং টেনসেন্টের মতো চীনা টেক জায়ান্টদের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগে পুষ্ট মুনশট বর্তমানে এআই খাতের শীর্ষস্থান ধরে রাখতে নিজেদের পুঁজি ও সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বাড়াচ্ছে। ব্লুমবার্গের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হংকংয়ের শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এই স্টার্টআপটি প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যায়নে নতুন করে ২ বিলিয়ন ডলারের তহবিল সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে।




















