যুক্তরাষ্ট্রে ডিসপ্লে, মোবাইল ও অন্যান্য ভোক্তা ইলেকট্রনিক্স (কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স) বিভাগ থেকে বড় অঙ্কের কর্মী ছাঁটাই শুরু করেছে দক্ষিণ কোরিয়াভিত্তিক প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স। এই ছাঁটাই প্রক্রিয়ার ফলে দেশটির নিউ জার্সি ও টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে কর্মরত কর্মীদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট অভ্যন্তরীণ নথিপত্র ও এ বিষয়ে অবগত দুটি বিশ্বস্ত সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় তথ্য দেওয়া সূত্রগুলো নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি।
আকস্মিক সদর দপ্তর স্থানান্তর ও ছাঁটাইয়ের সমীকরণ
এক বিবৃতিতে স্যামসাং জানিয়েছে, ‘স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স আমেরিকা’ বা এসইএ (SEA) সদর দপ্তর নিউ জার্সির এঙ্গলউড ক্লিফস থেকে টেক্সাসে স্থানান্তরের পরিকল্পনার কারণে নিউ জার্সির ৭৩৯টি পদে প্রভাব পড়েছে। উল্লেখ্য, এসইএ মূলত ভোক্তা প্রযুক্তি পণ্য নিয়ে কাজ করে, যেখানে কোম্পানির চিপ বা সেমিকন্ডাক্টর বিভাগ অন্তর্ভুক্ত নয়।
স্যামসাং জানিয়েছে, এই স্থানান্তরের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কর্মীদের সিংহভাগকেই টেক্সাসে বদলি হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে এবং বাকিদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। তবে ঠিক কতজনকে ছাঁটাই করা হয়েছে, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানায়নি কোম্পানিটি। অন্যদিকে, টেক্সাসের প্ল্যানো অফিসে মোবাইল বিভাগসহ বিভিন্ন শাখার প্রায় ১০০ কর্মীকে ইতিমধ্যে ছাঁটাই করা হয়েছে বলে চাকরি হারানো এক কর্মী নিশ্চিত করেছেন।
স্যামসাংয়ের এই সিদ্ধান্তটিকে বেশ আকস্মিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ, এক বছরও হয়নি নিউ জার্সির নতুন অফিসে জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে এসইএ-র কর্মীরা কাজ শুরু করেছিলেন। গেল বছরের সেপ্টেম্বরে সেই অফিস উদ্বোধনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা মার্কিন প্রতিনিধি সভার সদস্য জশ গটহাইমারের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, নিউ জার্সিতে প্রায় ১ হাজার ২০০ কর্মী কর্মরত ছিলেন।
রয়টার্সের দেখা কিছু নথিতে দেখা গেছে, গত ৩০ জুনের এক নোটিশে স্যামসাং কিছু কর্মীকে ‘কোম্পানিজুড়ে কর্মী কমানো’ সংক্রান্ত বার্তা পাঠায়, যেখানে এর প্রভাব ‘যথেষ্ট বড় পরিসরে’ পড়বে বলে উল্লেখ করা হয়। পেশাজীবীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘লিংকডইন’-এর বিভিন্ন পোস্ট পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, টেক্সাস ও নিউ জার্সির সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং কর্মীসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ৩০ জনেরও বেশি কর্মী গত কয়েক সপ্তাহে চাকরি হারানো বা কোম্পানি ছাড়ার কথা জানিয়েছেন।
চিপ বিভাগে রেকর্ড মুনাফা, লোকসানের ঝুঁকিতে মোবাইল
সদর দপ্তর স্থানান্তরের কারণে কর্মী ছাঁটাই চললেও, এটি স্যামসাংয়ের অভ্যন্তরীণ ব্যবসায়িক বৈপরীত্য ও সংকটকেই স্পষ্ট করে তুলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) উন্মাদনার কল্যাণে বিশ্ববাজারে চিপের চড়া চাহিদার মুখে এ বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে স্যামসাংয়ের মুনাফা প্রায় ১৯ গুণ বাড়ার আভাস মিলেছে। চিপ বিভাগের এই সুবর্ণ সময়ের বিপরীতে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে স্যামসাংয়ের মোবাইল ও ভোক্তা ইলেকট্রনিক্স বিভাগে।
স্মার্টফোনের বাজারে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাপলের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং টেলিভিশন ও গৃহস্থালি পণ্যের বাজারে টিসিএল (TCL) ও হাইসেন্স (Hisense)-এর মতো চীনা ব্র্যান্ডগুলোর চাপের মুখে পড়েছে স্যামসাং। চিপের উচ্চ মূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ঝিমিয়ে পড়েছে কোম্পানিটির ভোক্তা প্রযুক্তি পণ্য বিভাগ। বাজার বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এবার হয়তো ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লোকসানের মুখ দেখতে যাচ্ছে স্যামসাংয়ের মোবাইল বিভাগ।
টেক্সাসমুখী প্রযুক্তি খাত ও কর্মীদের মাঝে আতঙ্ক
স্যামসাংয়ের এই কর্মী ছাঁটাইয়ের পদক্ষেপ বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতের বর্তমান চিত্রের বাইরে কিছু নয়। মাইক্রোসফট, অ্যামাজন ও মেটার মতো শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও এআই অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়াতে গিয়ে অন্য বিভাগ থেকে কর্মী ছাঁটাই করছে। পাশাপাশি, টেসলা ও ওরাকলের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানির পথ অনুসরণ করে কম কর ও ব্যবসাবান্ধব নিয়মনীতির জন্য পরিচিত টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে নিজেদের মূল কার্যক্রম ও সদর দপ্তর সরিয়ে নিচ্ছে স্যামসাং। টেক্সাসে আগে থেকেই স্যামসাংয়ের চিপ কারখানা ও প্ল্যানোতে একটি মোবাইল হাব রয়েছে।
এসইএ-এর একজন বর্তমান কর্মী বলেছেন, সাম্প্রতিক এই ছাঁটাইয়ের পর স্যামসাং কর্মীদের মনে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। চিপ বিভাগে সব সম্পদ ও মনোযোগ ঢেলে দেওয়ার কারণে সামনে হয়তো হোম অ্যাপ্লায়েন্স, হোম এন্টারটেইনমেন্ট ও মোবাইল বিভাগগুলোকে একীভূত করা হতে পারে।
তবে এক বিবৃতিতে স্যামসাং স্পষ্ট করেছে যে, তাদের ভোক্তা পণ্য ব্যবসায় এই মুহূর্তে বিশ্বজুড়ে বড় কোনো পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নেই। প্রযুক্তি ও এআই ইকোসিস্টেমের মধ্যে বিভিন্ন দলকে আরও কাছাকাছি এনে সংগঠনকে দক্ষ করে তুলতেই সদর দপ্তর স্থানান্তর করা হচ্ছে। নথিপত্র অনুসারে, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ চিপ বিভাগসহ যুক্তরাষ্ট্রে স্যামসাং ইলেকট্রনিক্সের মোট কর্মী সংখ্যা ছিল ১১,৭৭০ জন।
এদিকে, স্যামসাংয়ের আইটি সেবা সরবরাহকারী সহযোগী কোম্পানি ‘স্যামসাং এসডিএস আমেরিকা’ও নিউ জার্সির রিজফিল্ড পার্ক থেকে ১৭৯টি পদ বিলুপ্তির আভাস দিয়েছে। তবে স্যামসাং দাবি করেছে, এই পরিবর্তনটি কেবলই স্যামসাং এসডিএস-এর উত্তর আমেরিকা সদর দপ্তর স্থানান্তরের কারণে হচ্ছে এবং এর সঙ্গে সাধারণ ছাঁটাই বা পুনর্গঠনের কোনো সম্পর্ক নেই।



















