চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা থেকে সরে এসে স্পেনের বৃহত্তম মোবাইল অপারেটর মাসঅরেঞ্জ নতুন করে নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম কেনার জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে।
প্রযুক্তিবিষয়ক সাময়িকী ডেটা সেন্টার ডাইনামিকস (DCD) ও স্পেনের দৈনিক এক্সপানসিওনের প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, আগামী অক্টোবরেই নতুন এ দরপত্র আহ্বান করা হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে স্পেনের মোবাইল নেটওয়ার্কে নোকিয়া ও স্যামসাংয়ের মতো সরবরাহকারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
২০২৪ সালে সুইডিশ প্রতিষ্ঠান এরিকসনের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী মাসঅরেঞ্জের নেটওয়ার্ক থেকে ধাপে ধাপে হুয়াওয়ের সরঞ্জাম কমিয়ে আনার পরিকল্পনা ছিল। একই সঙ্গে চীনের আরেক প্রতিষ্ঠান জেডটিইর সরঞ্জামও সরিয়ে ফেলার কথা ছিল।
চুক্তির লক্ষ্য অনুযায়ী ২০২৭ সালের মধ্যে হুয়াওয়ের অংশ ৫৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৭ শতাংশে এবং এরিকসনের অংশ ৪২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬৩ শতাংশ করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। জেডটিইর প্রায় ৪ শতাংশ সরঞ্জাম পুরোপুরি সরিয়ে ফেলার লক্ষ্যও ছিল।
তবে প্রথম ধাপের কাজ আংশিকভাবে শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলেছে। বর্তমানে মাসঅরেঞ্জের নেটওয়ার্কে এরিকসনের অংশ প্রায় ৫৭ শতাংশ, হুয়াওয়ের ৪৩ শতাংশ এবং জেডটিইর কোনো সরঞ্জাম নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরিকসনকে একক সরবরাহকারী হিসেবে পুরো নেটওয়ার্কের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে এখন আর আগ্রহী নয় মাসঅরেঞ্জ। নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে এরিকসনের ব্যর্থতার বিষয়টিও নতুন সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
ইউরোপের সাইবার নিরাপত্তা নীতিও বড় কারণ
নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম নির্বাচন নিয়ে মাসঅরেঞ্জের সিদ্ধান্তে ইউরোপের পরিবর্তিত সাইবার নিরাপত্তা নীতিরও প্রভাব রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রস্তাবিত নতুন সাইবার নিরাপত্তা বিধানে হুয়াওয়ে ও জেডটিইর মতো ‘উচ্চঝুঁকির’ সরবরাহকারীদের সরঞ্জাম নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফাইভজি, মোবাইল, ফিক্সড ও স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক থেকে সরিয়ে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আসতে পারে।
এ কারণে অক্টোবরের দরপত্রে হুয়াওয়ে অংশ নিলেও তাদের সরঞ্জাম পরবর্তী সময়ে আইনগত কারণে সরাতে হলে সেই ব্যয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকেই বহন করতে হবে—এমন শর্ত দিতে পারে মাসঅরেঞ্জ।
সুযোগ বাড়ছে নোকিয়া-স্যামসাংয়ের
নতুন দরপত্রে স্পেনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অঞ্চলে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ৩.৫ গিগাহার্টজ ব্যান্ডের কভারেজ বাড়ানোর কাজ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
এক্ষেত্রে নোকিয়া ও স্যামসাংয়ের মতো আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা প্রতিযোগিতামূলক দর দিতে পারলে মাসঅরেঞ্জের নেটওয়ার্কে তাদের উল্লেখযোগ্য অংশীদারত্ব তৈরি হতে পারে।
তবে হুয়াওয়ের জন্যও দরজা পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটি দরপত্রে অংশ নিয়ে বিজয়ী হলে ভবিষ্যতে ইউরোপীয় বিধিনিষেধের কারণে সরঞ্জাম পরিবর্তনের সম্ভাব্য ব্যয় তাদের বহন করতে হতে পারে।
ইউরোপে চীনা সরঞ্জাম সরানোর বড় খরচ
ইউরোপের টেলিকম নেটওয়ার্ক থেকে চীনা সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের আর্থিক প্রভাবও বড়। জিএসএমএ-এর হিসাবে, পুরো ইউরোপে এ ধরনের সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনে সরাসরি কয়েক দশক বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে। সরবরাহকারী প্রতিযোগিতা কমে গেলে পরোক্ষ ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্পেনের অন্যান্য অপারেটরের নেটওয়ার্কেও চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। ভোডাফোনের রেডিও নেটওয়ার্কে হুয়াওয়ের সরঞ্জামের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও টেলিফোনিকা তাদের মোবাইল নেটওয়ার্কে চীনা প্রযুক্তি ব্যবহার করছে না।
ফলে মাসঅরেঞ্জের নতুন দরপত্র শুধু একটি কোম্পানির সরবরাহকারী পরিবর্তনের বিষয় নয়, বরং ইউরোপের টেলিকম অবকাঠামো থেকে চীনা প্রযুক্তি সরিয়ে নেওয়ার বৃহত্তর কৌশলেরও অংশ হয়ে উঠতে পারে।






















