কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ঘিরে বিশ্বজুড়ে নতুন শিল্প ও ব্যবসার বিস্তার ঘটছে। বাড়ছে উন্নত চিপ, সার্ভার ও ডেটা সেন্টারের চাহিদা। এসব প্রযুক্তিপণ্য তৈরিতে খনি থেকে খনিজ উত্তোলন, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন এবং সার্ভারের চূড়ান্ত সংযোজন—বিভিন্ন ধাপে যুক্ত রয়েছেন বহু দেশের প্রতিষ্ঠান ও কর্মীরা। তবে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে অংশ নিলেও এআই ব্যবসার আর্থিক সুবিধা সমানভাবে পাচ্ছে না সবাই। মুনাফার বড় অংশ যাচ্ছে প্রযুক্তির নকশা ও মেধাস্বত্বের নিয়ন্ত্রণ থাকা অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছে।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা ইউএনসিটিএডির এক প্রতিবেদনে এ বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, এআই সরবরাহ শৃঙ্খলের সবচেয়ে মূল্যবান ধাপগুলোয় মুনাফা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। অন্যদিকে কাঁচামাল সরবরাহ, উৎপাদন ও পণ্য সংযোজনের মতো কাজে যুক্ত অনেক দেশ ও প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম অর্থনৈতিক সুবিধা পাচ্ছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশের সঙ্গে যুক্ত ছিল এআই চিপ ও সার্ভার। পণ্য বাণিজ্যের মূল্যভিত্তিক প্রবৃদ্ধিতে এসব পণ্যের অবদান ছিল ৪২ শতাংশ। এ পরিসংখ্যান এআই অবকাঠামোর ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি এ খাত থেকে সৃষ্ট সম্পদের বড় অংশ কারা পাচ্ছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
খনি থেকে সার্ভার, দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খল
এআই পরিচালনার উপযোগী উন্নত সার্ভার তৈরিতে দীর্ঘ ও জটিল সরবরাহ শৃঙ্খল কাজ করে। এর শুরু খনি থেকে বিভিন্ন খনিজ উত্তোলনের মাধ্যমে। পরে এসব কাঁচামাল প্রক্রিয়াজাত করে তৈরি করা হয় সেমিকন্ডাক্টর চিপ ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ। সার্ভারের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও শীতলীকরণ ব্যবস্থাও এ উৎপাদনপ্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সবশেষে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ একত্র করে তৈরি হয় পূর্ণাঙ্গ সার্ভার ব্যবস্থা।
দেশভেদে এ প্রক্রিয়ায় কাজের ধরনও আলাদা। চিলি ও পেরুর মতো দেশ এআই হার্ডওয়্যার তৈরিতে প্রয়োজনীয় খনিজ সরবরাহ করে। সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান। অন্যদিকে মালয়েশিয়া ও মেক্সিকোর মতো দেশ সার্ভারসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্যের চূড়ান্ত সংযোজনের কাজে যুক্ত।
তবে সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপের অর্থনৈতিক মূল্য এক নয়। কোনো দেশ কাঁচামাল সরবরাহ করলেই চূড়ান্ত পণ্য বিক্রির বড় অংশ তার হাতে আসে না। একইভাবে উৎপাদন ও সংযোজনের কাজে বিপুলসংখ্যক কর্মী যুক্ত থাকলেও তাঁদের শ্রমের বিপরীতে পাওয়া অর্থ চূড়ান্ত পণ্যের মোট মূল্যের তুলনায় কম হতে পারে। বিপরীতে প্রযুক্তির নকশা, উন্নত চিপের নকশা তৈরি এবং মেধাস্বত্বের মালিকানা থেকে তুলনামূলক বেশি আয় করার সুযোগ রয়েছে।
কাঁচামালের মূল্য চূড়ান্ত দামের সামান্য অংশ
ইউএনসিটিএডির প্রতিবেদনে এ বৈষম্যের একটি উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, উন্নত এআই সার্ভার তৈরিতে ব্যবহৃত সিলিকন, তামা ও টিনের মোট মূল্য চূড়ান্ত পণ্য বিক্রির দামের মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশ।
অর্থাৎ, এআই হার্ডওয়্যার তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সরবরাহ করা হলেও পণ্যের চূড়ান্ত মূল্যে এসব উপকরণের আর্থিক অবদান তুলনামূলকভাবে সামান্য। তবে কাঁচামালের এ হিসাবের বাইরে খনিজ উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় থাকতে পারে।
এনভিডিয়ার সার্ভার ব্যবস্থায় মুনাফার চিত্র
এআই সরবরাহ শৃঙ্খলে মুনাফা বণ্টনের পার্থক্য বোঝাতে এনভিডিয়ার তৈরি জিবি২০০ এনভিএল৭২ সার্ভার ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করেছে ইউএনসিটিএডি। উন্নত এআই মডেল পরিচালনায় ব্যবহৃত এ অবকাঠামোর মূল্য প্রায় ৩৩ লাখ ডলার।
প্রতিবেদনটিতে সার্ভারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সুবিধা কীভাবে বণ্টিত হয়, তা তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, উন্নত এআই চিপের নকশা ও প্রযুক্তির মালিকানা ধরে রাখার কারণে এনভিডিয়া এ ব্যবসায় বড় আর্থিক সুবিধা পায়। প্রতিষ্ঠানটি চিপের নকশা তৈরি করলেও উৎপাদনের জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে।
এ চিত্র থেকে বোঝা যায়, শুধু পণ্য উৎপাদন বা সংযোজনের সঙ্গে যুক্ত থাকাই এআই শিল্পের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। বরং প্রযুক্তির নকশা, মেধাস্বত্ব ও উচ্চমূল্যের প্রযুক্তিগত কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ মুনাফা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে সুযোগ ও বাধা
এআই প্রযুক্তির বাজার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর খনিজ রপ্তানি, উৎপাদন ও সংযোজনের কাজের সুযোগও বাড়ছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশগুলো বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত হলেই এআই শিল্প থেকে সৃষ্ট সম্পদের বড় অংশ তাদের হাতে আসছে না।
প্রযুক্তির নকশা ও উন্নয়নের মতো উচ্চমূল্যের কার্যক্রমে প্রবেশ করা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কঠিন। এ খাতে বিপুল মূলধন, উন্নত প্রযুক্তি, গবেষণা এবং দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন। পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক বাধা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাও নতুন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
ফলে এআই অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা পেতে শুধু কাঁচামাল সরবরাহ বা পণ্য সংযোজনের ওপর নির্ভর করাই যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, গবেষণা, দক্ষ জনশক্তি এবং নিজস্ব উদ্ভাবন গড়ে তোলার সুযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে এআই বাজারের দ্রুত সম্প্রসারণের সুফল পেলেও এর সবচেয়ে মূল্যবান অর্থনৈতিক সুবিধার বড় অংশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাইরে থেকে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।



















