দেশের সর্বস্তরের জনগণের দোরগোড়ায় উচ্চগতির ব্রডব্যান্ডসহ মানসম্মত টেলিযোগাযোগ সেবা পৌঁছে দিতে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘টেলিকমিউনিকেশনস নেটওয়ার্ক অ্যান্ড লাইসেন্সিং রিফর্ম পলিসি ২০২৫’ এবং এর অধীনে থাকা লাইসেন্সিং গাইডলাইনসমূহে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি এবং টেলিযোগাযোগ বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনে (বিটিআরসি) অনুষ্ঠিত পাঁচটি বিশেষ সভার নির্দেশনার পর এই পরিমার্জিত খসড়া তৈরি করা হয়। গত ২৪ মে, রবিবার পরিমার্জিত এই খসড়াটি সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠিয়েছে কমিশন।
চার লাইসেন্সে রূপান্তর ও নতুন নাম
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মূলত চারটি প্রধান লাইসেন্সিং গাইডলাইনে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। এগুলো হলো—সিএমএসপি (CMSP), আইএসপি (ISP), টিসিএসপি (TCSP) এবং আইসিএসপি (ICSP)।
নতুন নীতিমালায় পূর্বের ‘ফিক্সড টেলিকম সার্ভিস প্রোভাইডার’ বা এফটিএসপি (FTSP) লাইসেন্সের নাম পরিবর্তন করে ‘ইন্টারনেট Peering বা ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (ন্যাশনওয়াইড)’ এবং ‘ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (ডিস্ট্রিক্ট)’ করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ের আইএসপি অপারেটররা যাতে বড় ন্যাশনওয়াইড অপারেটরের অধীনে ‘রিসেলার’ নিয়োগ করতে পারে, সেই সুযোগও নতুন খসড়ায় যুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া, পূর্বের এনআইসিএসপি (NICSP) লাইসেন্সের নাম বদলে এখন ‘টাওয়ার অ্যান্ড কানেক্টিভিটি সার্ভিস প্রোভাইডার’ বা টিসিএসপি (TCSP) করা হচ্ছে। আইসিএসপি (ICSP) লাইসেন্সকে ‘ফ্যাসিলিটি-বেসড’ এবং ‘নন-ফ্যাসিলিটি বেসড’—এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। নন-ফ্যাসিলিটি বেসড লাইসেন্সের ফি ও চার্জ কম হলেও, এই অপারেটরদের দেশীয় সাবমেরিন কেবল অপারেটরদের কাছ থেকে কমিশন নির্ধারিত একটি ন্যূনতম ব্যান্ডউইথ বাধ্যতামূলকভাবে নিতে হবে।
নেটওয়ার্ক বিস্তারে নতুন লক্ষ্যমাত্রা ও ফি বৃদ্ধি
নতুন গাইডলাইন অনুযায়ী, জেলা পর্যায়ের ইন্টারনেট সেবাদাতাদের নেটওয়ার্ক বিস্তারে কঠোর ‘রোল-আউট টার্গেট’ দেওয়া হয়েছে। লাইসেন্স পাওয়ার প্রথম থেকে পঞ্চম বছর পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ন্যূনতম ৪, ৮, ১৬, ২৪ ও ৩৬টি জেলায় নেটওয়ার্ক বিস্তার করতে হবে। পাশাপাশি নেটওয়ার্কের পিওপি (PoP) স্থাপনের ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ এলাকার পাশাপাশি ২০ শতাংশ খানা বা হাউজহোল্ড কাভারেজের শর্ত যোগ করা হয়েছে।
এদিকে টিসিএসপি এবং সিএমএসপি লাইসেন্সের মেয়াদ ১৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ২০ বছর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে টিসিএসপি লাইসেন্সের ক্ষেত্রে একুইজিশন ও রিনিউয়াল ফি ১০ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪ কোটি টাকা এবং বার্ষিক লাইসেন্স ফি ৩ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৈদেশিক মালিকানার সীমা ও পরিবারতন্ত্র রোধ
দেশীয় টেলিকম খাতের টেকসই উন্নয়ন ও কৌশলগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিদেশি বিনিয়োগের সীমানায় পরিবর্তন এনেছে বিটিআরসি। এখন থেকে আইএসপি, টিসিএসপি, সিএমএসপি এবং আইসিএসপি (ফ্যাসিলিটি-বেসড) লাইসেন্সের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মালিকানার পরিমাণ হবে ৮০ শতাংশ। তবে দেশের কৌশলগত স্বার্থ বিবেচনা করে আইসিএসপি লাইসেন্সের ক্ষেত্রে দেশীয় অংশীদারদের সিংহভাগ শেয়ার বা মালিকানা বাধ্যতামূলক রাখার পক্ষে মত দিয়েছে কমিশন। অপরদিকে, টেকসই অবকাঠামো গড়তে টিসিএসপি লাইসেন্সের ক্ষেত্রে বিদেশিদের সিংহভাগ শেয়ারের মালিকানার সুযোগ দেওয়া সমীচীন বলে মনে করে বিটিআরসি।
বাজারে অবৈধ একচেটিয়া প্রভাব এবং মালিকানা কেন্দ্রীকরণ রোধ করতে লাইসেন্স প্রাপ্তির যোগ্যতায় কঠোর নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ (সংশোধনী, ২০২৬) এর ধারা-৩৬ অনুযায়ী, কোনো একক ব্যক্তি বা তার পরিবারের কোনো সদস্যের নামে বা বেনামে একাধিক সচল লাইসেন্স থাকতে পারবে না। অর্থাৎ একই ব্যক্তি বা পরিবার একাধিক লাইসেন্সের সুবিধাভোগী বা বেনেফিশিয়ারি হলে তারা নতুন কোনো আইসিএসপি লাইসেন্স পাওয়ার যোগ্য হবেন না।
শঙ্কা ও খাত সংশ্লিষ্টদের অভিমত
টেলিকম বিশ্লেষক ও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বিটিআরসি’র নতুন এই গাইডলাইন দেশের প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট খাতকে একটি আধুনিক ও সমন্বিত কাঠামোয় নিয়ে আসবে। তবে তৃণমূলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ইন্টারনেট সেবাদাতারা (আইএসপি) আশঙ্কা করছেন, নতুন এই রোল-আউট টার্গেট এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে তারা বড় বড় ন্যাশনওয়াইড অপারেটরদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। তাই এই খসড়াটি চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে মাঠ পর্যায়ের সব অংশীজনের (Stakeholders) মতামত নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।




















