বাংলাদেশে মোবাইল যোগাযোগব্যবস্থাকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর করতে ২জি থেকে ৪জি নেটওয়ার্কে স্থানান্তর সময়ের দাবি। তবে এ পরিবর্তন বাস্তবায়নের আগে দেশের প্রায় ৬ কোটি ফিচার ফোন ব্যবহারকারীর ক্রয়ক্ষমতা, ৪জি নেটওয়ার্কের মান, বিকল্প হ্যান্ডসেটের বাজারচাহিদা এবং দেশীয় উৎপাদনশিল্পের ভবিষ্যৎ বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। প্রযুক্তির উন্নয়নের নামে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি ব্যয় চাপিয়ে দেওয়া কিংবা বৈধ শিল্পকে ঝুঁকির মুখে ফেলা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বাংলাদেশে বর্তমানে স্মার্টফোনের পাশাপাশি ফিচার ফোনেরও বড় বাজার রয়েছে। প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহারকারী ফিচার ফোনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে ২জি নেটওয়ার্ক বন্ধের বিষয়টি শুধু প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; এটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন যোগাযোগ, পারিবারিক ব্যয়, কর্মসংস্থান এবং দেশীয় হ্যান্ডসেট শিল্পের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ২০২৬ সালের ১৬ জুন সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে ২জি ব্যবহার কমিয়ে ৪জি প্রযুক্তিতে স্থানান্তরের বিষয়ে একটি কর্মশালা আয়োজন করে। আলোচনায় ব্যবহার কমার সম্ভাব্য হার বিবেচনায় তিনটি কৌশল উঠে আসে—বার্ষিক ১৫ শতাংশ হারে ব্যবহার কমানো গেলে ২০২৯ সাল, ১০ শতাংশ হারে কমানো গেলে ২০৩০ সাল এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে কমানো গেলে ২০৩১ সালকে সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা।
তবে ৬ কোটি ব্যবহারকারীকে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে নতুন প্রযুক্তিতে স্থানান্তর করা সহজ নয়। গ্রাহক নিজে থেকে নতুন ফোন কিনবেন—এমন ধারণার ওপর নির্ভর করে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হলে প্রত্যাশিত ফল নাও আসতে পারে। এজন্য সাশ্রয়ী ফোন, অপারেটরদের বিশেষ প্যাকেজ, কিস্তিতে কেনার সুযোগ, স্বল্পসুদের ঋণ এবং অতি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি ভর্তুকির ব্যবস্থা প্রয়োজন।
দেশীয় হ্যান্ডসেট বাজারে ২জি ফিচার ফোনের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে উৎপাদিত হ্যান্ডসেটের প্রায় ৬৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত উৎপাদিত হ্যান্ডসেটের প্রায় ৬৬ দশমিক ২ শতাংশ ছিল ২জি ফিচার ফোন।
এ অবস্থায় ২০২৭ সালে বৈধ উৎপাদন বা সরবরাহ সীমিত করা হলেও ২০২৯ সাল পর্যন্ত যদি ২জি ফোনের চাহিদা বজায় থাকে, তাহলে বাজারে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেই চাহিদা অবৈধ আমদানি ও গ্রে মার্কেটের মাধ্যমে পূরণ হতে পারে। ফলে বৈধ উৎপাদক ও আমদানিকারকেরা অসম প্রতিযোগিতায় পড়বেন। উৎপাদন কমলে কারখানার শ্রমিক, সরবরাহকারী, পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রেতাদের কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দেশে অবৈধ স্মার্টফোন বিক্রির হার প্রায় ৪০ শতাংশ। তবে অবৈধ হ্যান্ডসেটের বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা ছাড়া বৈধ উৎপাদন সীমিত করলে একই ধরনের ঝুঁকি ২জি ফোনের বাজারেও তৈরি হতে পারে। তাই উৎপাদন নিয়ন্ত্রণের আগে অবৈধ আমদানি ঠেকানো, বৈধ সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দেশীয় শিল্পের জন্য বাস্তবসম্মত রূপান্তর পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
বর্তমানে সাধারণ ২জি ফিচার ফোনের দাম প্রায় ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ৪জি ফিচার ফোনের দাম প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। ফলে গ্রাহককে নতুন ফোন কিনতে অতিরিক্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা ব্যয় করতে হতে পারে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য এই বাড়তি খরচ বড় বাধা।
উল্লেখ্য, প্রায় ১ বছর পূর্বে পরীক্ষামূলকভাবে দেশীয় ৬-৭ জন উৎপাদক 4G ফিচার ফোন (মূল্য ২০০০-২৫০০ টাকা) বাজারে ছাড়ে। পরবর্তীতে দেখা যায় এর বাজার চাহিদা প্রায় শুন্য। কোম্পানিগুলো অতপর বিশাল লোকসান করে ৩০-৪০% ডিস্কাউন্ট দিয়েএই ফোনের দাম পুনঃ নির্ধারন করে, কিন্তু তবুও প্রায় ৩০% ফোন এখনও অবিক্রীত রয়ে গেছে।
এ অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, শুধু ২জি ফোনের বিকল্প হিসেবে ৪জি ফোন বাজারে ছাড়লেই গ্রাহক সেটি কিনবেন না। দাম কমানো, নেটওয়ার্কের নির্ভরযোগ্যতা এবং বাস্তব আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। অপারেটরদের বিশেষ ভয়েস প্যাকেজ, কম কলরেট, ফোনের সঙ্গে সাশ্রয়ী সংযোগ প্যাকেজ, কিস্তিতে বিক্রি এবং ভিওএলটিই সুবিধা সহজে চালুর ব্যবস্থা গ্রাহকের আগ্রহ বাড়াতে পারে। পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনে প্রণোদনা, যন্ত্রাংশ আমদানিতে যৌক্তিক শুল্কসুবিধা এবং অতি নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য সরকারি সহায়তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
২জি থেকে ৪জি প্রযুক্তিতে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, দেশের সব এলাকায় কি ৪জি নেটওয়ার্ক নির্ভরযোগ্য? বিভিন্ন এলাকায় নেটওয়ার্কের গতি, কাভারেজ এবং সংযোগের স্থিতিশীলতা নিয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান না করে ২জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করলে গ্রাহককে নতুন ফোন কেনার পরও দুর্বল নেটওয়ার্কের সমস্যায় পড়তে হতে পারে।
৪জি ফোন থাকলেই নির্ভরযোগ্য কল নিশ্চিত হয় না। সংশ্লিষ্ট এলাকায় পর্যাপ্ত ৪জি কাভারেজ, ভিওএলটিই সেবার কার্যকারিতা এবং ফোনের সঙ্গে অপারেটরের নেটওয়ার্কের সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকায় নেটওয়ার্কের বাস্তব সক্ষমতা যাচাই না করে ২জি বন্ধ করা হলে জরুরি যোগাযোগসহ দৈনন্দিন প্রয়োজন ব্যাহত হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে মোবাইল অপারেটরদের আগে নেটওয়ার্কের দুর্বলতা দূর করতে হবে। সরকার এর উচিত স্বাধীনভাবে নেটওয়ার্কের মান যাচাই, গ্রাহকের অভিযোগ মূল্যায়ন এবং নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণে অপারেটরদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের মাধ্যমে অপারেটররা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কমানো ও স্পেকট্রাম আরও দক্ষভাবে ব্যবহারের সুবিধা পেতে পারে। সেই সুবিধার অংশ গ্রাহকের কাছেও পৌঁছাতে হবে।
সারা দেশে একই সময়ে ২জি নেটওয়ার্ক বন্ধ না করে পরীক্ষামূলক ও পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতি অনুসরণ করা অধিক বাস্তবসম্মত হতে পারে। প্রথমে ঢাকা মেট্রো এলাকায়, যেখানে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের ৪জি নেটওয়ার্কের কাভারেজ ও সেবার মান পরীক্ষায় সন্তোষজনক প্রমাণিত হবে, সেখানে নির্দিষ্ট এলাকায় ২জি বন্ধ করে দেখা যেতে পারে। এতে কতজন গ্রাহক বিকল্প নেটওয়ার্কে যেতে পারছেন, কতজন সমস্যায় পড়ছেন এবং জরুরি যোগাযোগে কী ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা পরিমাপ করা সম্ভব হবে।
পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের ফলাফল সন্তোষজনক হলে পরবর্তী ধাপে অন্যান্য মহানগর, এরপর জেলা সদর ও উপজেলা সদরে একই পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে। সবশেষে পর্যাপ্ত নেটওয়ার্ক কাভারেজ ও সাশ্রয়ী বিকল্প নিশ্চিত হওয়ার পর গ্রামাঞ্চলে ২জি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। লক্ষ্য হতে পারে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশব্যাপী রূপান্তর সম্পন্ন করা, তবে সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে পরীক্ষার ফলাফল ও গ্রাহকের প্রস্তুতির ভিত্তিতে।
এ ক্ষেত্রে অপারেটরভিত্তিক পদ্ধতিও বিবেচনা করা যেতে পারে। যে এলাকায় কোনো অপারেটরের ৪জি নেটওয়ার্ক শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য, সেখানে প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে সেই অপারেটরের ২জি সেবা পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে প্রভাব মূল্যায়ন করা যেতে পারে। তবে একই এলাকায় অন্য অপারেটরের নেটওয়ার্ক দুর্বল হলে তাদের ক্ষেত্রেও একই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া উচিত হবে না।
২জি থেকে ৪জি প্রযুক্তিতে উত্তরণ সফল করতে হলে সরকার, বিটিআরসি, মোবাইল অপারেটর, দেশীয় উৎপাদক, আমদানিকারক, বিক্রেতা এবং সাধারণ গ্রাহকের মতামত সমান গুরুত্বে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ, এই পরিবর্তনের প্রভাব শুধু টেলিযোগাযোগ খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; কোটি মানুষের যোগাযোগ, পরিবারের ব্যয় এবং দেশীয় শিল্পের কর্মসংস্থানও এর সঙ্গে জড়িত।
প্রযুক্তির আধুনিকায়ন প্রয়োজন, কিন্তু তার আগে বিকল্প ফোনের দাম ও প্রাপ্যতা, ৪জি নেটওয়ার্কের মান এবং গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমে নির্ভরযোগ্য নেটওয়ার্ক ও সাশ্রয়ী বিকল্প, এরপর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম, এবং সবশেষে ধাপে ধাপে ২জি বন্ধ—এই নীতিই বাংলাদেশের বাস্তবতায় অধিক গ্রহণযোগ্য রূপান্তরের ভিত্তি হতে পারে।




















