চীনের শিক্ষা খাতে এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী বিপ্লব ঘটে চলেছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তি। সরকারি নীতি এবং বেসরকারি খাতের উদ্যোগের সম্মিলিত শক্তিতে এআই এখন শিক্ষাকে আরও ব্যক্তিগত, কার্যকর এবং প্রযুক্তি-বান্ধব করে তুলছে। ফলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং শিক্ষাবিদ—সকলের জন্যই শেখার অভিজ্ঞতা বদলে যাচ্ছে।
ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে একজন শিক্ষক বহু ছাত্রছাত্রীকে একই পদ্ধতিতে পাঠদান করেন, সেখানে এআই নিয়ে এসেছে আমূল পরিবর্তন। এআই-চালিত প্ল্যাটফর্মগুলো প্রতিটি শিক্ষার্থীর শেখার গতি, দুর্বলতা এবং আগ্রহ বিশ্লেষণ করে তাদের জন্য ব্যক্তিগতকৃত পাঠ্যসূচি তৈরি করছে।
উদাহরণস্বরূপ, চীনের এডটেক (EdTech) কোম্পানির স্কুইরেল এআই (Squirrel AI)-এর কথা বলা যায়। তাদের সিস্টেম শিক্ষার্থীর প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারে, সে কোন ধারণায় দুর্বল। এরপর সেই অনুযায়ী অতিরিক্ত অনুশীলন বা ভিডিও লেকচারের সুপারিশ করে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা নিজেদের গতিতে শিখতে পারছে এবং পিছিয়ে পড়ার ভয় কমছে।
চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
চীনের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৮ সালে “AI+ Education” নামে একটি অ্যাকশন প্ল্যান চালু করেছে। এর লক্ষ্য হলো ২০২৫ সালের মধ্যে একটি আধুনিক এআই-ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা। এই পরিকল্পনায় স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে AI প্রযুক্তির ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে চীনের বৃহত্তম এআই কোম্পানি বাইদু, স্কুলগুলোর জন্য সম্পূর্ণ এআই সমাধান (Baidu AI Education Solution) প্রদান করে। এর মধ্যে রয়েছে ভার্চুয়াল টিউটর, স্মার্ট ক্লাসরুম এবং প্রশাসনিক সরঞ্জাম। বাইদু তাদের “ব্রেইন” প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে স্মার্ট ক্লাসরুম তৈরি করছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ এবং ক্লাসের কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করা হয়।
আইফ্লাইটেক তাদের ভয়েস রিকগনিশন এবং ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (NLP) প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্মার্ট এডুকেশন প্রোডাক্ট তৈরি করেছে, যা ভাষা শেখা এবং ক্লাসরুমের কার্যক্রমকে সহজ করে।
সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি দেশের প্রযুক্তি জায়ান্ট যেমন বাইদু (Baidu), আলিবাবা (Alibaba), টেনসেন্ট (Tencent) এবং আইফ্লাইটেক (iFlytek)-এর মতো কোম্পানিগুলো বিশালাকার বিনিয়োগ করেছে এবং নিজস্ব এআই-ভিত্তিক শিক্ষা সমাধান তৈরি করছে।
উদাহরণ হিসেবে আইফ্লাইটেক (iFlytek) এর কার্যক্রম দেখা যাক।
শিক্ষাগত কর্মক্ষমতার পাশাপাশি, আইফ্লাইটেক শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতেও মনোনিবেশ করে। ৪০০,০০০-এরও বেশি প্রকাশিত নিবন্ধ এবং এক মিলিয়নেরও বেশি মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শের কেসের তথ্য গ্রহণ করে, আইফ্লাইটেক একটি এআই সহযোগী তৈরি করেছে যা শিশুদের আবেগ চিহ্নিত করে, সহানুভূতি প্রকাশ করে এবং শিশুদের মানসিক সমস্যা সমাধানে হালকা হস্তক্ষেপ প্রদান করে।
চীনের অবিকশিত অঞ্চলে এআই প্রযুক্তির প্রচার করছে আইফ্লাইটেক। ২০১৭ সাল থেকে, প্রায় ২০টি প্রদেশ এবং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে এআই-শিক্ষা জনকল্যাণ প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে, যা ১,১০০-এরও বেশি স্কুলে এআই-ভিত্তিক শিক্ষা সমাধান নিয়ে এসেছে। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য হল শহুরে এবং গ্রামীণ অঞ্চলের মধ্যে শিক্ষা সম্পদের ভারসাম্যহীনতার ফলে সৃষ্ট ব্যবধান কমানো।
এআই শুধু শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, শিক্ষকদের কাজও সহজ করে দিচ্ছে। বহুনির্বাচনী প্রশ্নপত্র বা সংক্ষিপ্ত উত্তরভিত্তিক পরীক্ষা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্যায়ন করতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে শিক্ষকদের মূল্যবান সময় বাঁচছে, যা তারা শিক্ষার্থীদের সাথে সরাসরি আলোচনা বা অন্যান্য সৃজনশীল কাজে ব্যয় করতে পারছেন। এছাড়াও, এআই শিক্ষকদের জন্য উন্নত মানের পাঠদানের উপকরণ এবং কৌশল তৈরি করে দিচ্ছে।
পাশাপাশি, এআই প্রযুক্তি শিক্ষাকে উন্নত করে প্রত্যেক শিক্ষককে পেশাদার সহায়তা প্রদানের জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তিবিদদের নির্বাচন করে। এই ব্যবস্থাগুলি শিক্ষকদের শিক্ষণ পদ্ধতি সমৃদ্ধ করতে, শিক্ষণের প্রভাব উন্নত করতে সহায়তা করে। উদাহরণস্বরূপ, শিজিয়াওয়ান স্কুলের জীববিজ্ঞান শিক্ষক ইয়াং ওয়েনকিয়ান ডিপসিকের মতো এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করে জেনেটিক্স পরীক্ষার জন্য সিমুলেটর তৈরি করে এবং সম্ভাব্যতা সিমুলেশন করে। তার শিক্ষার্থীরা রিয়েল-টাইম জিন সংমিশ্রণ পর্যবেক্ষণ করে এবং লিঙ্গ জন্ম অনুপাত সিমুলেট করে, উল্লেখযোগ্যভাবে দক্ষতা এবং অংশগ্রহণ বাড়িয়ে।
চীনের শিক্ষাব্যবস্থায় এআই প্রযুক্তির ব্যবহার এক অপ্রতিরোধ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি শেখার পদ্ধতিকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করার বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করেছে।






















