দীর্ঘ এক শতাব্দী ধরে বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক ও অর্থনৈতিক যে আধিপত্য ছিল, তা এখন এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। চীনের অত্যাধুনিক হাইপারসোনিক মিসাইল এবং বিরল খনিজ উপাদান বা ‘রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট’-এর ওপর বেইজিংয়ের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ পেন্টাগনের সামরিক কৌশলে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ-এর সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্য এই আশঙ্কাকে আরও ঘনীভূত করেছে।
২০ মিনিটেই ধ্বংস হতে পারে মার্কিন নৌবহর!
প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ এক চাঞ্চল্যকর দাবিতে জানিয়েছেন যে, চীনের নতুন প্রজন্মের হাইপারসোনিক মিসাইল (যেমন— DF-17 ও DF-27) যুদ্ধের প্রথম ২০ মিনিটেই আমেরিকার ১০টি বিমানবাহী রণতরী বা ক্যারিয়ার গ্রুপ ধ্বংস করার সক্ষমতা রাখে। শব্দের চেয়ে ৫ থেকে ১০ গুণ দ্রুতগামী এই মিসাইলগুলো তাদের নিখুঁত নিশানার কারণে মার্কিন ‘এজিস’ (Aegis) ডিফেন্স সিস্টেমকে সহজেই ফাঁকি দিতে পারে। পেন্টাগনের সাম্প্রতিক বিভিন্ন ‘ওয়ার গেম’ বা যুদ্ধ মহড়াতেও দেখা গেছে, চীনের এ ধরণের ঝটিকা আক্রমণের মুখে মার্কিন নৌবাহিনী বারবার পরাস্ত হচ্ছে।
রেয়ার আর্থ: চীনের হাতে আমেরিকার ‘গলা টিপে ধরার’ চাবিকাঠি
কেবল যুদ্ধক্ষেত্র নয়, বাণিজ্যিক ও উৎপাদন বাজারেও চীন এখন চালকের আসনে। বিশ্বের ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ ‘রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট’ (যেমন: নিওডিয়ামিয়াম, ল্যান্থানাম ও ডিসপ্রোসিয়াম) চীনের নিয়ন্ত্রণে।
আমেরিকার প্রতিরক্ষা শিল্পে এর প্রভাব:
মার্কিন প্রতিরক্ষা শিল্পের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত অস্ত্রগুলো তৈরিতে চীনের এই খনিজ উপাদানগুলো অপরিহার্য:
F-35 ও F-22 ফাইটার জেট: একটি F-35 তৈরিতে প্রায় ৪১৮ কেজি রেয়ার আর্থ ম্যাটেরিয়াল প্রয়োজন।
ভার্জিনিয়া-ক্লাস সাবমেরিন: এসব সাবমেরিন তৈরিতে প্রায় ৫০০০ পাউন্ডের বেশি বিরল খনিজ লাগে।
M1 আব্রামস ট্যাংক ও টমাহক মিসাইল: এসব অস্ত্রের গাইডেন্স সিস্টেম এবং শক্তিশালী ম্যাগনেট তৈরিতে চীন থেকে আসা খনিজ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অনেক দেশের ওপর বড় অংকের শুল্ক (Tariff) আরোপ করলেও চীনের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশ জটিল। কারণ চীন যদি পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এই খনিজ উপাদানের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তবে আমেরিকার প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন লাইন মুহূর্তেই স্থবির হয়ে পড়বে। বিশেষজ্ঞরা একে দেখছেন চীনের ‘ডিজিটাল ও খনিজ অবরোধ’ হিসেবে।
২০২৬ সালে এসে এটি স্পষ্ট যে, কেবল অস্ত্রের সংখ্যা দিয়ে এখন আর শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা সম্ভব নয়। চীন যেভাবে কৌশলগত কাঁচামাল এবং হাইপারসোনিক প্রযুক্তিতে এগিয়ে গেছে, তা আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। সামনের দিনগুলোতে কেবল শুল্ক যুদ্ধ নয়, বরং খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণই নির্ধারণ করবে আগামীর সুপারপাওয়ার কে হবে।




















