আধুনিক নকশা আর পরিচ্ছন্ন ‘স্টক অ্যান্ড্রয়েড’ অভিজ্ঞতার আকর্ষণে মটোরোলা স্মার্টফোন কিনে এখন বিপাকে পড়েছেন দেশের বহু গ্রাহক। গত কয়েক মাস ধরে ব্র্যান্ডটির নির্দিষ্ট কিছু মডেলে নেটওয়ার্ক ও কানেক্টিভিটি নিয়ে গুরুতর সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যা এখন গ্রাহকদের জন্য ‘গলার কাঁটা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ করে ইনডোর সিগন্যাল ড্রপ, সচল ফোন ‘বন্ধ’ দেখানো এবং কল না আসার মতো ‘ভুতুড়ে’ সব সমস্যায় অতিষ্ঠ ব্যবহারকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। ২০২৬ সালে এসে যখন দেশে ফাইভজি প্রযুক্তির বিস্তার ঘটছে, তখন এমন মৌলিক সমস্যা ব্র্যান্ডটির বিশ্বাসযোগ্যতাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
মটোরোলার বিভিন্ন ব্যবহারকারী গ্রুপ ঘুরে দেখা গেছে, ‘মটোরোলা ৬০ ফিউশন’, ‘মটো ৫০’ এবং ‘৬০ প্রো’সহ বেশি কিছু মডেলের ব্যবহারকারীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।
রেদওয়ানুল হক নামে এক ভুক্তভোগী তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “আমার মটোরোলা সিক্সটিন ফিউশন ফোনে মাঝে মাঝে সিগন্যাল থাকলেও সিম বন্ধ দেখায়। কেউ কল দিলে ফোন বন্ধ পায়। ফোন অফ-অন করলে ঠিক হয়, কিন্তু কিছুক্ষণ পর আবার একই অবস্থা। আরও অবাক করা বিষয় হলো, চার্জে দিলেও চার্জ নেয় না, রিস্টার্ট না দেওয়া পর্যন্ত চার্জিং শুরু হয় না।”
একই ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন তৌহিদুল ইসলাম জিসান। তিনি বলেন, “সিমের নেটওয়ার্ক ফুল দেখাচ্ছে, ডাটা দিয়ে সব কাজ করা যাচ্ছে। কিন্তু কল আসছেও না, যাচ্ছেও না।”
এস এন পারভেজ ফকির এবং মো. টনিকের মতো আরও অনেক গ্রাহক অভিযোগ করেছেন যে, ফোন সচল থাকা সত্ত্বেও অন্য কেউ ফোন দিলে তা ‘বন্ধ’ বা ‘অপ্রাপ্য’ দেখায়। অনেক ক্ষেত্রে বাসার ভেতরে বা লিফটে ঢুকলেই ফোন ‘নো সার্ভিস’ মোডে চলে যাচ্ছে, যেখানে একই স্থানে অন্য ব্র্যান্ডের ফোনে শক্তিশালী সিগন্যাল বজায় থাকছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, মটোরোলার এই সংকটের মূলে রয়েছে তাদের মডেমের ‘সফটওয়্যার অপ্টিমাইজেশন’ এবং বাংলাদেশের টেলিকম অপারেটরদের নেটওয়ার্ক প্রোটোকলের সাথে সমন্বয়হীনতা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মূলত একটি ‘আইএমএস (IMS) রেজিস্ট্রেসন এরর’। ফোন যখন ফোরজি বা ফাইভজি নেটওয়ার্কে থাকে, তখন ভয়েস কলের জন্য একে একটি বিশেষ চ্যানেলে সক্রিয় থাকতে হয়। মটোরোলার অনেক মডেলে ডাটা কানেকশন সচল থাকলেও ভয়েস চ্যানেলটি ‘আইডল’ বা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ফলে স্ক্রিনে নেটওয়ার্ক বার থাকলেও আদতে ফোনটি কল গ্রহণে ব্যর্থ হয়। ইনডোর সিগন্যাল ড্রপের পেছনে ফোনের এন্টেনা ডিজাইনের ‘লো গেইন’কে দায়ী করছেন অনেক প্রকৌশলী।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি এক ধরণের কৌশল। বাহ্যিক চাকচিক্য আর কাগজের কলমে বেশি স্পেসিফিকেশন দেখিয়ে গ্রাহক টানলেও, একটি ফোনের মূল কাজ অর্থাৎ নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে চরম অবহেলা করা হয়েছে।
কেন মটোরোলা ফোন এখন এড়িয়ে চলবেন?
বর্তমান পরিস্থিতিতে কেন গ্রাহকদের মটোরোলা ফোন কেনা উচিত নয়, সে বিষয়ে প্রযুক্তি বিশ্লেষকরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ উল্লেখ করেছেন:
অনির্ভরযোগ্য যোগাযোগ: স্মার্টফোনের মূল কাজ নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু মটোরোলার এই ‘ঘোস্ট নেটওয়ার্ক’ সমস্যার কারণে জরুরি মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ কল মিস করার উচ্চ ঝুঁকি থাকে।
সফটওয়্যার বাগ: সাম্প্রতিক সিস্টেম আপডেটের পর নেটওয়ার্কের পাশাপাশি চার্জিং সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে মটোরোলার সফটওয়্যার টিম স্থানীয় নেটওয়ার্কের উপযোগী করে আপডেট দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
রিস্টার্ট বিড়ম্বনা: বারবার ফোন রিস্টার্ট দিয়ে নেটওয়ার্ক ফিরে পাওয়া কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, যা আধুনিক প্রিমিয়াম ফোনের ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য।
পুনঃবিক্রয় মূল্য হ্রাস: এই ধরনের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার ত্রুটির খবর ছড়িয়ে পড়ায় সেকেন্ড-হ্যান্ড মার্কেটে মটোরোলার চাহিদা এবং দাম দ্রুত কমে যাচ্ছে।
মটোরোলা বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এই সমস্যাগুলো নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা কার্যকর সফটওয়্যার প্যাচ (Update) দেওয়া হয়নি। সমাধান না আসা পর্যন্ত মটোরোলার এই মডেলগুলো এড়িয়ে চলাই নিরাপদ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।



















