প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বৈত আচরণ দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অধিকাংশ সময় নতুন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বাজারে আসার পর প্রচারণায় বলা হয়, তাদের তৈরি এআই এতটাই শক্তিশালী যে তা মানবজাতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। নিজেদের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একদিকে অত্যন্ত শক্তিশালী বলে দাবি করে, একইসঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ বলেও সতর্ক করে। তাদের এ ধরণের প্রচারণায় জনমনে প্রশ্ন উঠছে, এ ‘ভয়’ কি আসলেই নিরাপত্তার জন্য, নাকি এটি ব্যবসার কৌশল?
সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে এআই কোম্পানি অ্যানথ্রোপিকের নতুন মডেল ‘ক্লড মিথোস’। কোম্পানিটি দাবি করছে, সাইবার সিকিউরিটি বা ডিজিটাল নিরাপত্তার ত্রুটি খুঁজে বের করতে মডেলটি মানুষের চেয়ে বহুগুণ দক্ষ। এটি এতটাই দক্ষ যে, ভুল হাতে পড়লে এটি বিশ্ব অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হতে পারে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠানটি বিপদের কথা বললেও প্রযুক্তিটি নিয়ে তাদের বাণিজ্যিক অগ্রযাত্রা থামিয়ে রাখেনি।
প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, কোনো কোম্পানি যখন নিজের পণ্যকে ‘ভয়ংকর’ হিসেবে প্রচার করে, তখন তার পেছনে গভীর কিছু স্বার্থ কাজ করে। একে বলা হয় ‘ভয়-ভিত্তিক বিপণন’। সমালোচকদের দাবি, প্রযুক্তির মাধ্যমে হওয়া বাস্তব ক্ষতি আড়াল করতে এআই কোম্পানিগুলো আমাদের সম্ভাব্য এক মহাপ্রলয়ের (অ্যাপোক্যালিপস) চিন্তায় ব্যস্ত রাখতে চায়। পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব, শ্রম শোষণ কিংবা বিদ্যমান সামাজিক কাঠামো ধ্বংসের মতো বিষয়গুলো যখন আলোচনায় আসার কথা, তখন মানুষ ব্যস্ত থাকে—‘এআই কি রোবট হয়ে পৃথিবী দখল করে নেবে’ —এ জাতীয় প্রশ্নে।
এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই নীতিশাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ শ্যানন ভ্যালর বলেন, ‘আপনি যখন এ প্রযুক্তিকে অতিপ্রাকৃত বা অতি-মানবিক কোনো বিপদ হিসেবে তুলে ধরবেন, তখন সাধারণ মানুষ নিজেকে অসহায় মনে করবে। তখন মনে হবে, এ বিপদ থেকে কেবল ওই প্রযুক্তি নির্মাতারাই আমাদের বাঁচাতে পারে।’
ইতিহাস বলছে, ভয় দেখিয়ে প্রচার পাওয়ার কৌশল এ খাতে নতুন নয়। ২০১৯ সালে ওপেনএআইয়ের তৎকালীন নির্বাহী ডারিও আমোদেই (যিনি এখন অ্যানথ্রোপিকের প্রধান) দাবি করেছিলেন, তাদের ‘জিপিটি-২’ মডেলটি এতটাই বিপজ্জনক যে তারা এটি উন্মুক্ত করবেন না। অথচ মাত্র কয়েক মাস পরেই তারা এটি জনসমক্ষে নিয়ে আসে। ওপেনএআইয়ের বর্তমান প্রধান স্যাম অল্টম্যানও ২০১৫ সাল থেকেই ‘এআই মানবসভ্যতা ধ্বংস করতে পারে’ এমন বার্তা দিয়ে আসছেন। অথচ গত কয়েক বছরে এ খাতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত সম্পদ ও কোম্পানির শেয়ারের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অনেকেই আবার অ্যানথ্রোপিকের ‘মিথোস’ মডেলের সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এআই নাউ ইনস্টিটিউটের প্রধান বিজ্ঞানী হাইডি খ্লাফ মনে করেন, অ্যানথ্রোপিক তাদের নতুন মডেলের সাফল্যের ক্ষেত্রে কোনো স্বীকৃত মানদণ্ড বা ‘ফলস পজিটিভ রেট’ প্রকাশ করেনি। এটি ছাড়াই কোনো সিকিউরিটি টুল কতটা কার্যকর, তা বোঝা অসম্ভব। এমনকি গুঞ্জনও রয়েছে, পর্যাপ্ত কম্পিউটিং পাওয়ারের অভাবেই হয়তো তারা এটি বাজারে ছাড়তে দেরি করছে, আর নিরাপত্তার অজুহাত দিয়ে বিষয়টিকে আড়াল করার চেষ্টা করছে।
বাস্তবতা হলো, এআই কোম্পানিগুলো শুরুতে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও এখন তারা লাভজনক পাবলিক কোম্পানি হওয়ার দৌড়ে শামিল। বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিতে সুরক্ষা নীতি শিথিল করছে ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের মতো প্রতিষ্ঠান।
শ্যানন ভ্যালরের যুক্তি, পারমাণবিক শক্তি কিংবা জৈব অস্ত্রের মতো বিষয়গুলো যদি নিয়ন্ত্রণ ও শাসনের আওতায় আনা সম্ভব হয়, তবে একটি চ্যাটবট কেন মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকবে? আসলে এই প্রযুক্তিগুলো কোনো অলৌকিক শক্তি নয়, বরং মুনাফার উদ্দেশ্যে তৈরি পণ্য মাত্র।
মেটাভার্স বা বিটকয়েন বিশ্ব অর্থনীতি দখল করবে— সিলিকন ভ্যালিতে পূর্বে এমন অনেক ভবিষ্যদ্বাণী শোনা গিয়েছে। কিন্তু সেগুলোর কোনটাই এখনো পূর্ণতা পায়নি। তাই এআই-এর এই ‘ভীতি’ কি আগামীর অন্ধকার ভবিষ্যৎ, নাকি শেয়ার বাজারে আধিপত্য বিস্তারের এক সুনিপুণ চিত্রনাট্য, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতত কোম্পানিগুলো সাধারণ ব্যবহারকারীদের বিশ্বাস করাতে চায়, তারা যে দৈত্যটি তৈরি করেছে, তার চাবিকাঠি শুধু তাদের হাতেই থাকা নিরাপদ।



















