দেশে ফোরজি (4G) মোবাইল নেটওয়ার্কের বিস্তার ঘটলেও এখনও দেশের ৪৭ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট সেবার বাইরে রয়ে গেছে। ব্যবহারের হার কিছুটা বাড়লেও সে অনুপাতে ইন্টারনেট সংযোগের গতি ও সেবার গুণগত মান উন্নত হয়নি। বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট গতির সাম্প্রতিক সূচকে মোবাইল ইন্টারনেটে ১০৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯১তম এবং ফিক্সড ব্রডব্যান্ডে ১৪১টি দেশের মধ্যে অবস্থান ৯৩তম।
বিশেষজ্ঞ ও খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটালাইজেশনের যুগে ধীরগতির ইন্টারনেট ও দুর্বল অবকাঠামো দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদেশী বিনিয়োগ, ফ্রিল্যান্সিং, রপ্তানি খাত, স্টার্টআপ এবং সরকারের লক্ষ্যভুক্ত ‘ক্যাশলেস সোসাইটি’ বা নগদ অর্থহীন সমাজ বিনির্মাণের ওপর।
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত ‘দি আনফিনিশড ডিজিটাল রেভল্যুশন: এক্সপান্ডিং ইন্টারনেট অ্যাকসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চগতির ইন্টারনেট এখন আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি দেশের উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ফোরজি নেটওয়ার্ক শতভাগ মানুষের কাছে পৌঁছালেও বাস্তবে মাত্র ৫৩ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। নেটওয়ার্ক কাভারেজ থাকা সত্ত্বেও প্রতি নয়জনের মধ্যে তিনজন অনলাইনে অনুপস্থিত। সংস্থাটি জানিয়েছে, অবকাঠামো থাকলেই ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হয় না। উচ্চমূল্যের হ্যান্ডসেট, ডেটা প্যাকেজের চড়া দাম এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবই ইন্টারনেট ব্যবহারের মূল প্রতিবন্ধকতা।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, বর্তমানে ব্যক্তিগত পর্যায়ে দেশে ৫৮.৬ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন, আর মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮৯.৫ শতাংশ।
সরকার যখন ডিজিটাল লেনদেন, কিউআর কোড এবং মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (MFS) মাধ্যমে ক্যাশলেস সমাজ গড়ার জোর তাগিদ দিচ্ছে, তখন ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা বা ধীরগতি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। পেমেন্ট প্রসেসিংয়ে বিলম্ব এবং লেনদেন ব্যর্থ হওয়ার কারণে গ্রাহক ও ব্যবসায়ীদের আস্থা ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহিত রহমান বলেন, “যেকোনো ডিজিটাল কার্যক্রমের জন্য নির্ভরযোগ্য সংযোগ অপরিহার্য। গতি কম থাকলে পুরো ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইন্টারনেট না থাকলেও যেন লেনদেন চালু রাখা যায়, সে ধরনের বিকল্প প্রযুক্তি উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।”
ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশের (আইবিএফবি) সভাপতি লুতফুন নিসা সৌদীয়া খান এবং প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা জহিরুল ইসলাম মনে করেন, ইআরপি (ERP), ক্লাউড সার্ভিস ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনায় দ্রুতগতির ইন্টারনেট এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি মৌলিক অবকাঠামো।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যম ডাউনলোড স্পিডে বাংলাদেশে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি যেখানে মাত্র ৪৩ এমবিপিএস (Mbps) এবং ব্রডব্যান্ডে ৬৬ এমবিপিএস, সেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে মোবাইল ইন্টারনেটের গতি ৬৮১ এমবিপিএস এবং সিঙ্গাপুরে ব্রডব্যান্ডের গতি ৪২১ এমবিপিএস। এমনকি নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ ভিয়েতনামেও মোবাইল ইন্টারনেট গতি প্রায় ১৮৮ এমবিপিএস।
ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, “গত সাত-আট বছর ধরে দেশে টেলিকম অবকাঠামোয় কাঙ্ক্ষিত গুণগত বিনিয়োগ হয়নি। ফোরজি থাকলেও মান বাড়েনি, অথচ প্রতিবেশী দেশগুলো ফাইভজিতে চলে গেছে। বিশেষ করে মোবাইল ইন্টারনেটে আমরা বেশ পিছিয়ে।”
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. এম মাসরুর রিয়াজ জানান, দেশের মোট রপ্তানির ১২ শতাংশই ডিজিটাল-নির্ভর। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে দেশে ‘ডিজিটাল ইকোনমি রিভোল্যুশন’ বা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা এখন সময়ের দাবি।
বিনিয়োগের পরিবেশ ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (বিডা) নির্বাহী সদস্য নাহিয়ান রহমান রচি জানান, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে ইন্টারনেট ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। এই লক্ষ্যেই তৃতীয় সাবমেরিন কেবল যুক্তকরণ, ফাইভজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা ‘স্টারলিংক’ (Starlink)-এর কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যা আগামীতে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।





















