এআই প্রযুক্তিতে নেতৃত্ব ধরে রাখতে অবকাঠামো তৈরিতে বিপুল অর্থ ঢালছে মার্কিন টেক জায়ান্টগুলো। ২০২৩ সালে এআইয়ের উত্থানের পর গত জুন পর্যন্ত গুগল, অ্যামাজন, মাইক্রোসফট ও মেটা খাতটিতে বিনিয়োগ করেছে মোট ১ লাখ ১০ হাজার কোটি বা ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। খবর এফটি।
টেক জায়ান্টদের এআই বিনিয়োগের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে ডেটা সেন্টার, উন্নত চিপ এবং এসব অবকাঠামো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায়।
রাইয়ান ম্যাকমরো, রেফ রোজনার-উদ্দিন ও হ্যানা মারফির যৌথ এ প্রতিবেদনে বলা হয়, এআইকে কেন্দ্র করে প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ সামনের দিনগুলোয় আরো বাড়বে। চলতি বছর সম্মিলিতভাবে ৭৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার খরচের পরিকল্পনা করেছে চার কোম্পানি।
রাইয়ান ম্যাকমরোর দলটি বলছে, বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো দ্রুত এআই অবকাঠামোনির্ভর ব্যবসার দিকে যাচ্ছে। এআই মডেল পরিচালনা ও গ্রাহককে কম্পিউটিং সুবিধা দিতে বিপুল পরিমাণ ডেটা সেন্টার, সার্ভার ও চিপের প্রয়োজন। ফলে অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এআই অবকাঠামোয় ব্যয় বৃদ্ধির প্রবণতা শিগগিরই থামার সম্ভাবনা কম। তবে এআইয়ের পেছনে ব্যয় করা বিপুল অর্থ কত দ্রুত আয় ও মুনাফায় রূপ নেবে তা এখন বিনিয়োগকারীদের কাছে বড় প্রশ্ন। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ করতে গিয়ে কোম্পানিগুলো যেন প্রচলিত ব্যবসার ওপর চাপ তৈরি না করে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এরই মধ্যে এআইয়ে বিপুল বিনিয়োগের কিছু সুফল পেতে শুরু করেছে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো। গুগল, অ্যামাজন ও মাইক্রোসফটের ক্লাউড ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। এআই ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কম্পিউটিং সক্ষমতা সরবরাহ করছে তারা। এসব প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের মধ্যে রয়েছে এআই খাতের স্টার্টআপ ওপেনএআই ও অ্যানথ্রপিক। এআইয়ের ব্যবহার বাড়ায় ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের চাহিদাও বাড়ছে। ফলে এ খাত থেকে আয় বাড়ছে তিন কোম্পানির।
এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগের চাপও কম নয়। বিপুল বিনিয়োগের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। বেড়েছে বিভিন্ন উপকরণের দাম। দেখা দিয়েছে মেমোরি চিপের সংকট। এর প্রভাব পড়েছে অ্যাপলের ব্যবসায়ও।
এআই প্রতিযোগিতায় বড় ধরনের বিনিয়োগ না করলেও চিপের দাম বেড়ে যাওয়ায় অ্যাপলের পণ্য বিক্রি ও মুনাফায় চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শেয়ারবাজারেও।
মেটার ক্ষেত্রে এআই থেকে আয়ের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। কোম্পানিটির নিজস্ব ক্লাউড ব্যবসা নেই। তবে বিজ্ঞাপন ব্যবসায় এআইয়ের ব্যবহার বাড়িয়ে গ্রাহকের কাছে আরো নির্দিষ্টভাবে বিজ্ঞাপন পৌঁছানোর চেষ্টা করছে কোম্পানিটি। ফলস্বরূপ দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) মেটার মোট আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেড়ে ৬ হাজার ১০০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এআই অবকাঠামোয় মেটার বড় বিনিয়োগ অবশ্য বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি করেছে। দ্বিতীয় প্রান্তিকের ফল প্রকাশের পর কোম্পানিটির শেয়ারদর ৮ শতাংশ কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু এআইয়ে কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তা দেখতে চাইছেন না। এ বিপুল ব্যয় শেষ পর্যন্ত আয় ও মুনাফা কতটা বাড়াতে পারছে, তাই দেখতে আগ্রহী তারা।
এদিকে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের সরাসরি প্রভাব পড়ছে কোম্পানিগুলোর নগদ অর্থপ্রবাহ বা ‘ফ্রি ক্যাশ ফ্লোর’ ওপর। গত বছর চার প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ ছিল ২০ হাজার কোটি ডলার, যা ২০২৪ সালের ২৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের তুলনায় কম।
বিশ্লেষকদের ধারণা, সামনের দিনগুলোয় এ পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। কারণ কোম্পানিগুলো এখন মুনাফার চেয়ে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পরিকাঠামো উন্নয়নে বেশি জোর দিচ্ছে। ফলে কোম্পানিগুলোর আয়ের মার্জিনে চাপ পড়ছে এবং তাদের বড় ধরনের ঋণ নিতে হচ্ছে।
গুগলের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে বলে উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। কোম্পানিটির ক্লাউড ব্যবসা গত বছরের তুলনায় ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার বেশি আয় করেছে। কিন্তু এআই অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগের কারণে ফ্রি ক্যাশ ফ্লো বা ব্যয় মেটানোর পর হাতে থাকা নগদ অর্থের প্রবাহে চাপ পড়েছে।
অ্যামাজনের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি জ্যাসিও বিনিয়োগকারীদের জানান, এআই অবকাঠামো তৈরির কারণে কিছু সময় কোম্পানিটির ফ্রি ক্যাশ ফ্লোতে চাপ থাকবে। কারণ একসঙ্গে অনেক ডেটা সেন্টার নির্মাণ করতে হচ্ছে। একটি ডেটা সেন্টার চালু হওয়ার পর গ্রাহকের কাছ থেকে আয় করার মতো সার্ভার স্থাপন করতেও প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে।
এ কারণে এআইয়ে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ এখন দুই ধরনের বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ায় ক্লাউড ও বিজ্ঞাপন ব্যবসায় আয় বাড়ছে। অন্যদিকে ডেটা সেন্টার, চিপ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় বিপুল ব্যয়ের কারণে নগদ অর্থের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।




















