দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত গাজীপুরের কালিয়াকৈরে অবস্থিত দেশের প্রথম হাই-টেক পার্ককে ‘ফ্ল্যাগশিপ’ আইটি ইন্ডাস্ট্রি পার্ক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য দীর্ঘদিন ধরে চলা অবকাঠামো, রাস্তাঘাট, জমি ও বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান করে অব্যবহৃত জমি কাজে লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর, রোবটিক্স, এআই এবং ইলেকট্রিক ভেহিকলস (ইভি) নিয়ে কাজ করতে ইচ্ছুক প্রতিষ্ঠানগুলোকে জমি বরাদ্দ দিতে প্রস্তুত বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (বিএইচটিপি)।
সরকারের ঘোষিত ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে শনিবার (৮ আগস্ট) সরেজমিনে পার্ক পরিদর্শন ও হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক শেষে এসব কথা জানান ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মজিবুর রহমান, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া, কালিয়াকৈরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিজ শামসুন নাহার শিলা এবং বিএইচটিপি-র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: ফজলুর রহমানসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা।
বৈঠক শেষে মন্ত্রী জানান, ইলেকট্রিক ভেহিকলের ওপর বিশেষ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের দেশে ইভি কারখানা তৈরিতে বড় ধরনের ট্যাক্স সুবিধা দেওয়া হবে। তবে পার্কের মোট ৮৫টি বরাদ্দের মধ্যে ৪০টি অপারেশনে থাকলেও নির্মাণাধীন ১৭টি এবং ১৮টি প্রতিষ্ঠান এখনও কাজ শুরু করেনি বলে তিনি উল্লেখ করেন। যারা বরাদ্দ নিয়েও কাজ শুরু করেনি, তাদের ডেকে জটিলতা খুঁজে বের করা হবে এবং কারও অবহেলা থাকলে জমি ফেলে রাখতে দেওয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এই ফ্রন্টিয়ার প্রযুক্তিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
পরিদর্শনকালে মন্ত্রী বলেন, “ইলেকট্রিক ভেহিকেল নিয়ে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিন্তু অনেক সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে এবং আমরা বিদেশীদেরকে বলবো যে তোমরা যদি ইলেকট্রিক ভেহিকেল দেশে করো তবে প্রচুর ট্যাক্স ফ্যাসিলিটি পাবে। আমরা ইনকারেজ করছি ইলেকট্রিক্যাল ভহকেলকে এখানে আসার জন্য। এই জন্য কেউ আসলে আমরা তাদের জমি দিতে প্রস্তুত আছি।”
বিনিয়োগে সরকারের সদিচ্ছার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী আরও বলেন, “কিছু কিছু জায়গা অনেকেই বরাদ্দ নিয়ে থাকলেও তারা প্রোজেক্ট শুরু করেনি। কী কারণে তারা কাজ শুরু করেনি তার কারণ শিগগিরই খুঁজে বের করা হবে। তাদের অসুবিধা গুলো সনাক্ত করা হবো। আর যারা প্রোডাকশনে আছে তাদের কোনো অসুবিধাগুলো সমাধানে চেষ্টা করবো। আর যারা আন্ডার ডেভেলপড পর্যায়ে আছে তাদের সঙ্গেও কথা বলবো। কেননা, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী ইনভেস্টর আনার জন্য পুশ করছেন’। আমার মনে হচ্ছে আমাদের এই পার্কের বিষয়ে আরো মনযোগী হতে হবে। এআই, ইভি এবং রোবটিকস এর মতো ফ্রন্টিয়ার প্রযুক্তি শিল্প গড়ার বিষয়ে বিশেষ নজর দেবো।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন, “এটি খুবই প্রোস্পেক্টিভ জায়গা। প্রধানমন্ত্রী প্রতিটি হাইটেক পার্কে বিনিয়োগ আনতে তাগিদ দিয়েছেন।” কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কের প্রকল্পের অবস্থা নিয়ে মন্ত্রী প্রথমে জানান যে, সেখানে ৪০টি প্রকল্প ইতোমধ্যে অপারেশনে রয়েছে, ১৭টি নির্মাণাধীন রয়েছে এবং ১৮টি এখনও কোনো কাজ করেনি, তাই শিগগিরই তাদের ডাকা হবে। এরপর কারও মধ্যে যদি কাজে নেগলেজেন্সি থাকে তবে তাদের বিষয়ে ভিন্ন চিন্তা করা হবে; কোনো জমি ফেলে রাখা যাবে না, জমি ব্যবহার করতে হবে।
বৈঠকে বিএইচটিপির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: ফজলুর রহমান জানান, কালিয়াকৈর হাই-টেক পার্কে এ পর্যন্ত মোট ৮৫টি প্রতিষ্ঠানকে জমি বা স্পেস বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৭টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান। এই ৮৫টির মধ্যে ৪০টি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ব্যবসা বা উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করেছে, ২৮টি নির্মাণাধীন এবং আরও ১৭টি শিগগিরই নির্মাণকাজ শুরু করবে।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরও জানান, পার্কে মোট বিনিয়োগ প্রস্তাবের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৬৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে ইতোমধ্যে বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ২৮৩ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা)। আর এ পর্যন্ত সরকার মৌলিক অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় করেছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে চীন, জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ৭টি প্রতিষ্ঠান থেকে মোট প্রায় ৬ ২৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে। দায়িত্ব গ্রহণের এক মাসের মধ্যে স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগে যেন কোনো প্রতিবন্ধকতা তৈরি না হয় এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে।
পরিদর্শন শেষে মন্ত্রী স্মার্ট টেকনোলজিসের ল্যাপটপ কারখানা, অনর মোবাইল কারখানা, সনি ব্রাভিয়ার টিভি কারখানা এবং ফাইবার অ্যাট হোমের অফিস সরেজমিনে ঘুরে দেখেন।




















